আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ধরন বদলেছে, বাড়ছে উদ্বেগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব হামলার ধরনে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। আগে যেখানে মূলত সশস্ত্র অপরাধী বা ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের সময় পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা হামলার শিকার হতেন, এখন সেখানে গ্রেপ্তার অভিযানে বাধা দেওয়া, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া, গুজবের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ হামলা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ কাঠামোর প্রতিও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের ওপর হামলা বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর গড়ে পুলিশের ওপর ৬০০টির বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই পুলিশের ওপর ৩১৭টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ ৬৬টি হামলার ঘটনা ঘটে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি করে, মার্চে ৬৩টি, মে মাসে ৫৫টি এবং জুনে ৪৯টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর আগেও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা সাধারণত বড় অভিযান, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম কিংবা দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় ঘটত। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্য স্থানেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। কখনো স্থানীয় উত্তেজনা, কখনো গুজব, আবার কখনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কারণে এসব হামলা হচ্ছে।

গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের আমবাগান এলাকায় মাদক মামলার এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার মুখে পড়ে পুলিশ। অভিযানের সময় আসামির সহযোগীরা পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে ডাবলমুরিং থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মবিনুল ইসলাম ছুরিকাঘাতে আহত হন। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পুলিশ মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও হামলাকারীদের সবাইকে তখন পর্যন্ত আটক করা সম্ভব হয়নি।

এর আগে ২৩ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) উপপরিদর্শক মো. ওসমান গনি ওরফে ফয়সাল দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। নিজ বাসার সামনে তাকে কুপিয়ে আহত করা হয়। তার পিঠে ৪৫টি সেলাই দিতে হয়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।

১৯ জুলাই কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় আরও একটি আলোচিত ঘটনা ঘটে। একটি মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেওয়ার পথে সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়ে তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। হামলায় চার পুলিশ সদস্য আহত হন। প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি হামলায় অংশ নেয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হলেও মূল আসামি পালিয়ে যায়।

এর আগে ১৬ জুলাই পাবনার সুজানগরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজন জড়ো করা হয় এবং পরে পুলিশের টহল দলের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও এক কনস্টেবল আহত হন। পুলিশের দুটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়।

শুধু পুলিশ নয়, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। গত ২২ মে সিলেটে ছিনতাইয়ের সন্দেহভাজন একজনকে আটক করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নিহত হন র‍্যাব সদস্য ইমন আচার্য। এর আগে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক কারবারিদের হামলায় আহত হন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে পুলিশের ওপর হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৯ সালে ৫৫৫টি এবং ২০২০ সালে ৪৪৯টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়। এরপর ২০২১ সালে ৬০৮টি, ২০২২ সালে ৬০১টি, ২০২৩ সালে ৬০৭টি, ২০২৪ সালে ৬৪৩টি এবং ২০২৫ সালে ৬০১টি হামলার ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, আবার কিছু অপরাধী গোষ্ঠীর মধ্যে ভয় কমে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।

তার মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়লে সমাজে অস্থিরতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করাও জরুরি। কারণ কার্যকর আইন প্রয়োগের জন্য জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশের ওপর হামলার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। একদিকে মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতার প্রভাব রয়েছে, অন্যদিকে কিছু অপরাধী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সাহসী হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, পুলিশের সদস্যদেরও দায়িত্ব পালনে আরও সতর্ক হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পর্যাপ্ত জনবল নিয়ে অংশ নেওয়া, বডি ক্যামেরা ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রতিটি হামলার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিনের একটি নেতিবাচক প্রবণতা পরিবর্তন করতে সময় প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ করলেই এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না। পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যখন দায়িত্ব পালনের সময় হামলার মুখে পড়েন, তখন তার প্রভাব শুধু বাহিনীর ওপর পড়ে না; এর প্রভাব পড়ে পুরো সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর। তাই হামলার এই পরিবর্তিত ধরন মোকাবিলায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত