রাশিয়ার সৈকতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা, শিশুসহ নিহত ৭

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের একটি জনবহুল সমুদ্রসৈকতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। এ ঘটনায় আরও অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে বেসামরিক এলাকাকে লক্ষ্য করে সংঘটিত অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে ঘটনাটি নতুন করে দুই দেশের চলমান সংঘাতকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

স্থানীয় সময় ভোরের দিকে হামলাটি সংঘটিত হয়, যখন সৈকতে পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা শত শত মানুষ অবস্থান করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, এরপর কয়েকটি ড্রোন নিচু উচ্চতায় উড়ে এসে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তেই সৈকতজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ জীবন বাঁচাতে চারদিকে ছোটাছুটি শুরু করে এবং আহতদের উদ্ধার করতে স্থানীয় বাসিন্দা ও জরুরি সেবাকর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

রাশিয়ার আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একটি শিশু ছাড়াও কয়েকজন নারী ও পুরুষ রয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহতদের নিকটস্থ হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে এবং গুরুতর আহতদের বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

হামলার পরপরই ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে নিরাপত্তা বাহিনী। সৈকত এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং আশপাশে সম্ভাব্য বিস্ফোরক বা অবিস্ফোরিত ড্রোনের অংশ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল অভিযান চালায়। একই সঙ্গে সাময়িকভাবে ওই এলাকার সমুদ্রসৈকত, পার্ক এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ইউক্রেন একযোগে একাধিক ড্রোন ব্যবহার করে হামলার চেষ্টা চালায়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ড্রোন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করতে সক্ষম হলেও কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, যার ফলে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটে। হামলার পর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

ক্রেমলিন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী এবং এর যথাযথ জবাব দেওয়া হবে। রুশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সামরিক স্থাপনা নয়, বরং জনসমাগমপূর্ণ একটি বিনোদন এলাকাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, যা সংঘাতকে আরও বিপজ্জনক দিকে নিয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করা হয়নি। তবে অতীতে কিয়েভ একাধিকবার বলেছে, তারা মূলত রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামো, অস্ত্রের গুদাম, বিমানঘাঁটি এবং যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যবহৃত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় তারা সাধারণত সরাসরি দায় স্বীকার করে না এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাশিয়ার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধের কৌশলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল ছাড়িয়ে এখন রাশিয়ার অভ্যন্তরের বিভিন্ন স্থানে ড্রোন হামলার সংখ্যা বেড়েছে। কম খরচে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম ড্রোন এখন দুই পক্ষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক এলাকাও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার আগে কোনো বড় ধরনের সতর্কবার্তা পাননি তারা। অনেকেই পরিবার নিয়ে অবকাশ কাটাতে সৈকতে এসেছিলেন। বিস্ফোরণের পর চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং আহতদের আর্তনাদে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের চিকিৎসা এবং নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

রাশিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজন শিশু ও কিশোরও রয়েছে। অনেকের শরীরে ধাতব টুকরো ঢুকে গেছে এবং কয়েকজন বিস্ফোরণের অভিঘাতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। চিকিৎসকদের পাশাপাশি মনোবিদদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যাতে ভয়াবহ ঘটনার মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া যায়।

ঘটনার পর রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা সতর্কতা আরও বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিমানবন্দর, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পর্যটন এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জনগণকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার এবং সন্দেহজনক কোনো বস্তু বা উড়ন্ত যন্ত্র দেখলে সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার বাড়ছে। ড্রোন প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন যুদ্ধক্ষেত্রের প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছে। সীমান্ত থেকে বহু দূরের শহর, শিল্পাঞ্চল কিংবা পর্যটনকেন্দ্রও এখন হামলার ঝুঁকির বাইরে নয়। এতে শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতিই নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। যুদ্ধরত উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলা এড়িয়ে চলার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে যুদ্ধের তীব্রতা কমার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সাম্প্রতিক এই হামলার জেরে রাশিয়া পাল্টা আরও কঠোর সামরিক অভিযান চালাতে পারে, যা সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়ার সৈকতে প্রাণহানির এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। শিশু, নারী ও নিরীহ নাগরিকদের মৃত্যু শুধু একটি দেশের নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগের বিষয়। সংঘাতের এই দীর্ঘ ছায়া যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই মানবিক বিপর্যয়ের পরিধিও বিস্তৃত হচ্ছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত