সোনালী ব্যাংকের ঋণসীমা তুলে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি শাখার ওপর দীর্ঘদিন ধরে থাকা ঋণ বিতরণের সীমাবদ্ধতা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে এখন থেকে ব্যাংকটি গ্রাহকের আবেদন ও ব্যাংকিং নীতিমালা অনুসরণ করে সব শাখা থেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ দিতে পারবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তকে সোনালী ব্যাংকের জন্য ব্যবসা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ হিসেবে দেখা হলেও একই সঙ্গে ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের আগে সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় শাখা, ফরেন এক্সচেঞ্জ করপোরেট শাখা, শিল্প ভবন করপোরেট শাখা, শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউ করপোরেট শাখা এবং চট্টগ্রামের লালদীঘি করপোরেট শাখার ওপর ঋণ বিতরণের নির্দিষ্ট সীমা ছিল। শাখাভেদে ৫ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার বেশি ঋণ অনুমোদনের সুযোগ ছিল না। ফলে বড় ও ভালো গ্রাহকের ঋণের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে।

সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এসব সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহার করেছে। ফলে এখন থেকে এসব শাখা আর আগের মতো নির্দিষ্ট অঙ্কের ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তবে নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার প্রকৃতি ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান বলেন, ব্যাংকের ভালো গ্রাহকদের বড় অংশ এসব গুরুত্বপূর্ণ শাখার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ঋণসীমার কারণে অনেক ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী অর্থায়ন করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী গ্রাহকেরা বাধার মুখে পড়ছিলেন। এখন সীমা উঠে যাওয়ায় ভালো ও যোগ্য গ্রাহকদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে।

সোনালী ব্যাংকের ওপর ঋণসীমা আরোপের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ২০০৭ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের আলোচিত হল-মার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির পর ব্যাংকটির ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো হয়।

তৎকালীন সময়ে ব্যাংকের বড় শাখাগুলোতে ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের ঝুঁকি কমাতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিনের এই নিয়ন্ত্রণের ফলে সোনালী ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরে আসে। তবে সময়ের সঙ্গে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ায় ঋণসীমা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সোনালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যাংকটির বড় গ্রাহকদের অনেকেই এসব সীমিত শাখার মাধ্যমে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করেন। দ্রুত অর্থায়নের প্রয়োজন হলেও সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণসীমা প্রত্যাহারের পাশাপাশি সতর্কতাও দিয়েছে। বিশেষ করে অতীতে বিতর্কিত বা খেলাপি ঋণের সঙ্গে যুক্ত গ্রাহকদের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই ছাড়া ঋণ না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় শাখায় একসময় ব্যাংকটির মোট ঋণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত ছিল। এ কারণে এই শাখার ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। আগে এই শাখা থেকে চলতি মূলধন খাতে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ ছিল। পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ২০ কোটি টাকা করা হয়। এখন সেই সীমাও আর থাকছে না।

ঋণসীমা প্রত্যাহারের পেছনে ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরও একটি কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন। ব্যবসা ও শিল্প খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন না হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের কয়েকটি বড় ঋণ অনুমোদন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে আরহাম মাল্টি ট্রেডিংয়ের জন্য ৪০ কোটি টাকা এবং মুন্নু গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মুন্নু ফেব্রিকসের জন্য ৫০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। আগে এসব ঋণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। ঋণসীমা প্রত্যাহারের ফলে এখন ব্যাংক নিজস্ব নিয়ম ও নীতিমালার ভিত্তিতে এ ধরনের ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

সোনালী ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থাও আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বর্তমানে তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালে ব্যাংকটি প্রায় ৯৮৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল। পরবর্তী সময়ে মুনাফার পরিমাণ আরও বেড়ে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে সোনালী ব্যাংকের আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ বাড়লেও সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নিয়ন্ত্রিত রয়েছে।

তবে ব্যাংকটির সামনে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অতীতে হল-মার্ক, বেক্সিমকো, থারমেক্স ও ওরিয়নের মতো বড় গ্রাহকের ঋণ খেলাপি হওয়ার ঘটনা এখনো ব্যাংকের জন্য চাপ তৈরি করে আছে। তাই নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সতর্কতা বজায় রাখা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকেরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণসীমা তুলে দেওয়া সোনালী ব্যাংকের জন্য ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে। তবে এই সুযোগ তখনই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে, যখন ঋণ বিতরণ হবে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়াতে পারলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির ভূমিকা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত