জবিতে সেমিনার ঘিরে সংঘর্ষ, আহত একাধিক নেতা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৮ বার

প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি সেমিনারকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তন এবং পরে শহীদ মিনার এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় উভয় পক্ষের একাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে রাজধানীর ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে একটি আলোচনা সেমিনারের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীন। সকাল থেকেই অনুষ্ঠান ঘিরে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

বেলা ১১টার দিকে জকসুর কয়েকজন নেতা-কর্মী এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি-সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। প্ল্যাকার্ডগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত শেষ করা, শিক্ষার্থীদের জন্য অস্থায়ী আবাসিক হল নির্মাণ, মেডিক্যাল সেন্টারে পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান নিয়োগের মতো দীর্ঘদিনের দাবি তুলে ধরা হয়। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইউজিসি চেয়ারম্যানের দৃষ্টি এসব সমস্যার দিকে আকর্ষণ করা।

এ সময় মিলনায়তনের প্রবেশমুখে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে জকসুর সদস্যদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে মৌখিক তর্কবিতর্ক হলেও পরে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জকসুর নেতা-কর্মীরা মিলনায়তনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করেন। সে সময় ইনকিলাব মঞ্চের কয়েকজন সদস্যও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রথম দফার উত্তেজনা সাময়িকভাবে প্রশমিত হলেও সেমিনার শেষ হওয়ার পর নতুন করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। দুপুরের দিকে শহীদ মিনারের সামনে ছাত্রদল, জকসু এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে আবারও হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে এবং কয়েকজন আহত হওয়ার কথা জানায়।

সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে রয়েছেন জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ, জকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আবদুল্লাহ আল ফারুক, জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ। তাঁদের কয়েকজনকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলও দাবি করেছে, সংঘর্ষে তাঁদের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন এবং তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ঘটনার পর জকসুর সহসভাপতি (ভিপি) রিয়াজুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি উত্থাপনের সময় তাঁদের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে এবং পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।

জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া অভিযোগ করেন, সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে আসার পর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। তাঁর দাবি, ছাত্রদলের সদস্যরা জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখসহ জকসুর ভিপি, জিএস ও এজিএসকে মারধর করেন। তিনি এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইউজিসি চেয়ারম্যানকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে ছাত্রশিবির এবং তাদের সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণভাবে সরে যেতে অনুরোধ করা হলেও তাঁরা তা মানেননি। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। তিনি আরও দাবি করেন, এই ঘটনায় ছাত্রদলেরও অনেক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যাতে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।

শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অবকাঠামোগত সমস্যা এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই পরিবেশ তৈরি না হয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে মতবিরোধ নতুন নয়। তবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস বা শিক্ষাবিষয়ক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সংযম প্রদর্শন, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঘটনার পর ক্যাম্পাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়েছে কি না কিংবা তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত