নারীর ব্যাংকিং অংশগ্রহণ কমছে, অর্থনীতিতে নতুন সংকেত

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৮ বার

প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ সহজ করা, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার, ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার এবং নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ ঋণ সুবিধার মতো পদক্ষেপের ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সেই অগ্রযাত্রায় কিছুটা ভাটা পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকে নারীদের আমানত রাখা এবং ঋণ নেওয়ার হার—দুই ক্ষেত্রেই কমেছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এই প্রবণতা শুধু ব্যাংকিং খাতের একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং নারীর আর্থিক সক্ষমতা, সঞ্চয় নিরাপত্তা এবং উদ্যোক্তা কার্যক্রমের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

গত কয়েক বছরে দেশে নারীদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার নারীদের জন্য ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের পথ সহজ করেছে। আগে যেখানে ব্যাংকে যেতে সামাজিক ও ভৌগোলিক নানা বাধার মুখে পড়তে হতো, সেখানে এখন বাড়ির কাছাকাছি থেকেই টাকা জমা রাখা, উত্তোলন এবং বিভিন্ন আর্থিক সেবা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এর পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণ এবং সহজে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সহায়তা করেছে। নিজের নামে একটি ব্যাংক হিসাব থাকা প্রয়োজন—এমন সচেতনতাও সমাজে আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে ব্যাংক হিসাবে নারী গ্রাহকের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

তবে চলতি বছরের মার্চের হিসাব কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোট ব্যাংক হিসাবের মধ্যে নারী গ্রাহকের অংশ সামান্য কমেছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিশ্রেণির আমানতের মধ্যেও নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে যে আমানত রয়েছে, তার বড় একটি অংশ ব্যক্তিশ্রেণির গ্রাহকদের। মার্চ শেষে ব্যক্তিশ্রেণির আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নারী গ্রাহকদের অংশ ছিল ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ মোট আমানতের পরিমাণ বাড়লেও নারীদের অংশীদারত্ব কিছুটা কমেছে।

ব্যাংক হিসাবে নারীদের উপস্থিতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশে ব্যক্তিগত আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ১০ লাখ ৫৯ হাজার। এর মধ্যে নারী হিসাবধারীর হার ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ হিসাবের সংখ্যা বাড়লেও মোট অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যায়নি।

রাজধানীর উত্তরার গৃহিণী মাহফুজা আক্তারের অভিজ্ঞতাও এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। সংসারের খরচ থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে তিনি ব্যাংকে সঞ্চয় করতেন। কিন্তু ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খরচ মেটাতে সম্প্রতি সেই টাকা তুলে নিতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর মতো অনেক নারীই জরুরি প্রয়োজনের সময় ব্যাংকের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের সঞ্চয় কমে যাওয়ার পেছনে মূল্যস্ফীতি, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা খরচ এবং পারিবারিক জরুরি প্রয়োজন বড় কারণ হতে পারে। অনেক পরিবারে আয় ও ব্যয়ের চাপ বেড়ে যাওয়ায় নারীদের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে। এতে সাময়িকভাবে পরিবারের সংকট কাটলেও ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা কমে যাচ্ছে।

শুধু আমানত নয়, ঋণের ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণ হিসাবের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৬ হাজার হয়েছে। এর মধ্যে নারী গ্রাহকের অংশ ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

ব্যক্তিশ্রেণির ঋণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ডিসেম্বর শেষে ব্যক্তিশ্রেণির নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। তবে এর মধ্যে নারীদের অংশ ২০ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।

নারীদের ঋণ গ্রহণ কমে যাওয়ার বিষয়টি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ নারী উদ্যোক্তা তৈরি, ক্ষুদ্র ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং পরিবারের আয় বৃদ্ধিতে নারী ঋণগ্রহীতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ কম নেওয়ার অর্থ হতে পারে, নতুন ব্যবসা শুরু বা বিদ্যমান উদ্যোগ সম্প্রসারণে নারীরা আগের তুলনায় কম আগ্রহী হচ্ছেন অথবা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন না।

ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি কিছুটা চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং ঋণ বিতরণে সতর্কতার কারণে এর প্রভাব নারীদের ওপরও পড়ছে।

এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জয়তুন বিজনেস সলিউশনসের চেয়ারম্যান আরফান আলী বলেন, ব্যাংক খাতের বর্তমান চাপের প্রভাব প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের ওপর বেশি পড়ছে। নারীরা যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করেন, তাই তাঁদের আমানত কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যেতে পারে।

তিনি মনে করেন, নারীদের ব্যাংকিং অংশগ্রহণ ধরে রাখতে নিয়মিত প্রচার, বিশেষ সুবিধা, আর্থিক শিক্ষা এবং ঋণ কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক গতি কমে যাওয়ার কারণে নারীরাও নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে অনেক ব্যাংক বর্তমানে ঋণ বিতরণে বেশি সতর্ক হওয়ায় নারী উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না।

বিশ্লেষকদের মতে, নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয় নয়; বরং তাঁদের সঞ্চয়, ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘমেয়াদে নারীদের আর্থিক ক্ষমতায়ন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যান তাই সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। নারীদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের যে ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছিল, তা ধরে রাখতে নতুন করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ নারীর আর্থিক নিরাপত্তা শক্তিশালী হলে শুধু পরিবার নয়, পুরো অর্থনীতিই আরও স্থিতিশীল ও গতিশীল হয়ে উঠবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত