উখিয়ায় সাড়ে ৬ লাখ গাছের চারা রোপণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৬ বার
উখিয়ায় সাড়ে ৬ লাখ গাছের চারা রোপণ
প্রকাশ: ১১ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, বনভূমি পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী ক্ষতিকর প্রভাব সফলভাবে মোকাবিলা করার এক সুদূরপ্রসারী ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ হিসেবে দেশজুড়ে চলমান ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মেগা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলায় এক বিরাট কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি বনভূমি এবং এর আশপাশের বিভিন্ন খালি স্থানে দেশীয় প্রজাতির প্রায় সাড়ে ছয় লাখ গাছের চারা অত্যন্ত সফলভাবে রোপণ করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের চিরচেনা সবুজের আচ্ছাদনকে পুনরুজ্জীবিত করে ফিরিয়ে আনছে। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কারণে উখিয়ার পাহাড়ি বনাঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং সবুজশূন্য হয়ে পড়েছিল। সেই বেহাল দশা কাটিয়ে প্রকৃতির রূপ বদলে দিতে এবং বনের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকারের বন বিভাগের এই সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের মাঝে দারুণ আশার সঞ্চার করেছে।
উখিয়া উপজেলার রাজাপালং, পালংখালী, জালিয়াপালং, রত্নাপালং এবং হলদিয়াপালং ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ এলাকার বিভিন্ন সরকারি বন বিভাগের জায়গা জুড়ে এই বিশাল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রোপণ করা এই বিপুলসংখ্যক চারার মধ্যে রয়েছে হরেক রকমের দেশি ও ঐতিহ্যবাহী প্রজাতির গাছ, যা স্থানীয় মাটির গুণাগুণ বজায় রাখতে বিশেষভাবে উপযোগী। এই গাছের তালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে গর্জন, নিম, ধারমারা, চাম্পা, চালতা, বহেরা, অর্জুন, জারুল, ছাতিয়ান, কদম, শিমুল, কানাইডিঙ্গা, সোনালু, পলাশ, বকাইন, পারুল, কৃষ্ণচূড়া, সেগুন, গামার, চিকরাশি, পিতরাজ, মেহগনি, চাম্বল, বাবলা, ঢাকিজাম, বট, চাপালিশ, বুদ্ধ নারিকেল, কাঠবাদাম এবং শিশুসহ প্রায় ত্রিশ প্রজাতিরও বেশি বহুমুখী গাছ। এত বিপুল প্রজাতির দেশীয় গাছের চমৎকার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এসব উদ্যান কেবল বনের সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করছে না, বরং প্রকৃতির নিজস্ব বৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখতে এক অনন্য ও শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে কাজ করছে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে গত রোববার উখিয়া রেঞ্জের থাইংখালী বিটে হেল্প প্রকল্পের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সৃজিত হওয়া দেড় শ হেক্টর দেশীয় মিশ্র প্রজাতির দ্রুতবর্ধনশীল বাগান সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় সুদূরপ্রসারী এই প্রকল্পের আওতায় বাগানে রোপণ করা চারাগুলোর সার্বিক বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য এবং নিয়মিত পরিচর্যা কার্যক্রম অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। চারাগুলোর অসাধারণ ও আশানুরূপ বৃদ্ধি এবং বাগানের রক্ষণাবেক্ষণের সার্বিক কাজ দেখে তিনি গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তাদের সাধুবাদ জানান। পরিদর্শনের একপর্যায়ে তিনি নিজহাতে বাগান এলাকায় একটি সবুজ নিম গাছ এবং একটি চাপালিশ গাছের চারা রোপণ করে এই মহৎ কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন। প্রতিমন্ত্রীর এই আকস্মিক ও উৎসাহব্যঞ্জক উপস্থিতি মাঠপর্যায়ের বনকর্মী ও স্থানীয় লোকজনের মাঝে কাজের উদ্দীপনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে জানান যে, উখিয়ার পাহাড়ি বনাঞ্চলগুলো বিগত দিনে অবৈধ দখল, গাছ কাটা এবং অন্যান্য নানা কারণে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। নতুন করে দেশীয় ও দ্রুতবর্ধনশীল বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সমন্বয়ে বাগান সৃজনের মাধ্যমে বনের এই সবুজ আচ্ছাদন কেবল বাড়ানোই সম্ভব হচ্ছে না, বরং এর ফলে পাহাড়ি এলাকার প্রধান সমস্যা মাটির ক্ষয় রোধ করা, স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করা এবং সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা অনেক বেশি সহজ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উখিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে ত্বরান্বিত বৃক্ষনিধন এবং ভূমিক্ষয়ের মতো মারাত্মক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোর মুখে নতুন করে এই বন সৃজনকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও দূরদর্শী একটি পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করছেন দেশের বিশিষ্ট পরিবেশবিদরা। দেশীয় প্রজাতির গাছের সুবিন্যস্ত সমাহারে গড়ে ওঠা এই সমস্ত তরুণ বাগানগুলো যখন আগামীতে পরিপূর্ণ বৃক্ষে পরিণত হবে, তখন একদিকে যেমন বনভূমির পরিমাণ ও সবুজের পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে তেমনি অসংখ্য পাহাড়ি পাখি, কীটপতঙ্গ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল ও অভয়ারণ্য গড়ে উঠবে।
প্রতিমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ পরিদর্শনের সময় তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মামুন, সহকারী বন সংরক্ষক মো. মনিরুল ইসলাম, উখিয়া উপজেলার সুযোগ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তারসহ উখিয়া রেঞ্জের বিভিন্ন স্তরের বন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় কমিউনিটি পেট্রল লিগ বা সিপিজি দলের নিবেদিতপ্রাণ সদস্যরা। উখিয়ার বনাঞ্চলে বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চলমান এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শতভাগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা এবং রোপণ করা প্রতিটি চারাকে পরম যত্নে বাঁচিয়ে রাখার সুদৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বন বিভাগ। তারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি এই চারাগুলো সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে উখিয়া উপজেলার সমগ্র পাহাড়ি এলাকাগুলোতে সবুজের সমারোহ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য রূপ ফিরে আসবে।
উখিয়ার দৌছড়ি বিট কর্মকর্তা এমদাদুল হাসান রনি অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে জানান যে, বর্তমানে রোপণ করা চারাগুলোর কোনোটি যাতে অযত্নে নষ্ট না হয়, সে জন্য নিয়মিত পরিচর্যা ও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি চারার স্বাভাবিক ও সুস্থ বৃদ্ধি শতভাগ নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করা, গোড়ায় প্রয়োজনীয় সার ও পানি দেওয়া এবং বনের চারপাশ রক্ষায় নিয়মিত কঠোর পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে, উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিন জোরালো ভাষায় বলেন যে, এই রেঞ্জের অধীনস্থ বিভিন্ন বিটে বন সৃজন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তাঁদের কাজের মূল লক্ষ্য কেবল নামমাত্র কিছু চারা রোপণ করাই নয়, বরং রোপণ করা প্রতিটি চারাকে পরম মমতায় টিকিয়ে রেখে অদূর ভবিষ্যতে সেগুলোকে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ঘন বনাঞ্চলে রূপান্তরিত করা। এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য বন বিভাগের নিজস্ব তদারকির পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি আরও দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই বাগানগুলো যখন পূর্ণতা লাভ করবে, তখন তা কেবল উখিয়ার স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করবে না, বরং জলবায়ুর পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা এবং বন্যপ্রাণীর জীবনচক্র সুরক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com