প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় রাশিয়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপকরণ, যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক সামগ্রী পাঠিয়েছে বলে একটি নতুন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে সম্প্রতি দুই ডজনের বেশি রুশ জাহাজ ইরানের কৌশলগত আমিরাবাদ বন্দরে পৌঁছেছে। এসব চালান তেহরানের অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এনবিসি নিউজের দাবি অনুযায়ী, গোয়েন্দা নথি ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই সরবরাহের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চালানগুলোর মধ্যে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম, গোলাবারুদ এবং বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক রয়েছে। এসব সামগ্রী ইরানের নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামোকে দ্রুত পুনরায় সচল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষক জিম ল্যামসনের সঙ্গে কথা বলেছে এনবিসি। তার মতে, রাশিয়া থেকে সামরিক সরঞ্জামের এমন সরবরাহ মস্কো ও তেহরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। একই সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামো যদি সাম্প্রতিক সংঘাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে থাকে, তাহলে কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও বিস্ফোরক সরবরাহ দেশটির জন্য তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে শুধু প্রস্তুত অস্ত্র নয়, উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সম্ভাব্য সরবরাহ সেই ঘাটতি পূরণের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।
কাস্পিয়ান সাগরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ অবশ্য নতুন নয়। ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডরসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এই সমুদ্রপথ ব্যবহার করে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে একই যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন নথি ও প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত নথিতেও রুশ জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এমজি-ফ্লোটের বিরুদ্ধে ইরানি সামরিক পণ্য ও ড্রোন-সংক্রান্ত উপাদান পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন জাহাজের মাধ্যমে কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের তথ্যও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিযোগকে বৃহত্তর রুশ-ইরান সামরিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক চালান পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজগুলোর কয়েকটি এমজি-ফ্লোটের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিষ্ঠানটি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নথিতে এমজি-ফ্লোটের মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিরুদ্ধে সামরিক পণ্য পরিবহনের অভিযোগ নথিভুক্ত রয়েছে। কিছু জাহাজ অতীতেও ইরান-রাশিয়া রুটে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালে ইরান থেকে রাশিয়ায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রেও কাস্পিয়ান সাগরের এই নেটওয়ার্ক ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছিল। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, আমিরাবাদ বন্দর থেকে রাশিয়ার বন্দরের দিকে সামরিক পণ্য পরিবহনে এমজি-ফ্লোটের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি জাহাজের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে আমিরাবাদ এখন দুই দেশের সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সম্পর্কের ভিত্তিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও দৃঢ় হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি ‘বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহযোগিতার বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। দুই দেশের সম্পর্কের এই বিস্তৃতি সামরিক সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও ইরান ও রাশিয়ার সামরিক যোগাযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের তৈরি শাহেদ সিরিজের ড্রোন রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো বহুবার জানিয়েছে। পরবর্তীতে রাশিয়া নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করে ইরানি নকশা ও প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে ড্রোন উৎপাদন বাড়িয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এখন পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, একই ধরনের সামরিক সহযোগিতার প্রবাহ উল্টো দিকেও আরও দৃশ্যমান হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ শুধু ইরান থেকে রাশিয়ায় সামরিক প্রযুক্তি বা অস্ত্র যাওয়ার বিষয় নয়, রাশিয়া থেকেও ইরানে অস্ত্র উৎপাদনের উপকরণ ও সামরিক সরঞ্জাম যাওয়ার সম্ভাবনা সামনে এসেছে। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ককে একমুখী অস্ত্র সরবরাহের বদলে পারস্পরিক সামরিক সহায়তার কাঠামো হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইরানে এসব সরঞ্জাম পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সংঘাতে দেশটির সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে দ্রুত পুনর্গঠন করতে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হবে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন পুনরায় বাড়াতে বিস্ফোরক, ইলেকট্রনিক উপাদান, ইঞ্জিন, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য শিল্প সরঞ্জামের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে কথিত রুশ চালানগুলো ইরানের সামরিক পুনর্গঠনের গতি বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে এই দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সত্যতা নিয়ে এখনো প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের সুযোগ সীমিত। এনবিসির প্রতিবেদনে গোয়েন্দা নথি ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের তথ্যের কথা বলা হয়েছে। রাশিয়া এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এসব দাবিকে ‘ভুয়া খবর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ফলে সরবরাহের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, চালানের প্রকৃতি এবং কোন কোন সামগ্রী ইরানে পৌঁছেছে—এসব বিষয়ে আরও স্বাধীন প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।
তারপরও অভিযোগটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রাশিয়া ও ইরান উভয় দেশই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে এবং উভয়েরই সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখা ও বাড়ানোর নিজস্ব কৌশল রয়েছে। ফলে এক দেশের প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম অন্য দেশ থেকে সরবরাহের ব্যবস্থা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
কাস্পিয়ান সাগরকেন্দ্রিক এই সম্ভাব্য সরবরাহব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান যদি ক্ষতিগ্রস্ত অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পারে, তাহলে দেশটির ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধ কৌশলে তার প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে তেহরানের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য এবং বৃহত্তর ভূরাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানে রাশিয়ার কথিত সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের খবর শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা ও চালানগুলোর প্রকৃত পরিমাণ স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও, কাস্পিয়ান সাগর হয়ে রাশিয়া-ইরানের সামরিক যোগাযোগ যে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে চলে এসেছে, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।