প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবতের যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ)। সংগঠনটির সদস্যরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আরএসএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং মোহন ভাগবত যুক্তরাষ্ট্রে গেলে তাঁকে কোনো ধরনের কূটনৈতিক সৌজন্য না দেখানো।
মোহন ভাগবত আগামী ২৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। নিউইয়র্ক শহরে তিনি রাখিবন্ধন উৎসবে অংশ নেবেন। ‘আমেরিকান হিন্দুজ ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ’ নামের একটি সংগঠন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তাঁর কানাডা ও যুক্তরাজ্য সফরেরও কথা রয়েছে।
ইউএসসিআইআরএফের চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোহন ভাগবতের সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিযোগ, আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলো খ্রিষ্টান, মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ওপর নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত।
ইউএসসিআইআরএফের আরেক সদস্য জেন মিলস বলেছেন, ভাগবতকে কোনো ধরনের কূটনৈতিক সৌজন্য দেখানো উচিত নয়। তাঁর সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে বৈঠকও করা উচিত হবে না। বরং আরএসএসের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি।
ভারত সরকার এখন পর্যন্ত ইউএসসিআইআরএফের এই দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
মোহন ভাগবতের সফর নিয়ে সমালোচনা করেছে ‘হিন্দুজ ফর হিউম্যান রাইটস’ নামের একটি সংগঠনও। রাখিবন্ধন উৎসবের প্রসঙ্গ তুলে সংগঠনটি বলেছে, এ ধরনের ঐক্য ও সম্প্রীতির অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে আরএসএসের ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্যের ধারণা আড়াল করা যায় না।
তাদের অভিযোগ, রাখিবন্ধনের মতো সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আবহ ব্যবহার করে কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের বিতর্কিত দিকগুলোকে আড়াল করা সম্ভব নয়।
চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে ইউএসসিআইআরএফ মার্কিন সরকারের কাছে আরএসএসের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করেছিল। ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে কমিশনটি ভারতকে ‘বিশেষভাবে উদ্বেগজনক দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করারও সুপারিশ করে।
তবে ইউএসসিআইআরএফের সুপারিশ মার্কিন সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। কমিশনটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে ধর্মীয় স্বাধীনতা পরিস্থিতি নিয়ে সুপারিশ ও নীতিগত পরামর্শ দিয়ে থাকে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসনের নিজস্ব প্রক্রিয়া রয়েছে।
ইউএসসিআইআরএফের প্রতিবেদনের সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর কঠোর সমালোচনা করেছিল। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল প্রতিবেদনটিকে একপেশে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দেন।
জয়সোয়ালের দাবি ছিল, ভারত একটি বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী দেশ। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে সামনে এনে ভারতের দীর্ঘদিনের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেছিলেন, ইউএসসিআইআরএফের প্রতিবেদন ভারতের বাস্তব পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না। বরং কমিশনটির কার্যক্রম নিয়েই প্রশ্ন তোলা উচিত।
মোহন ভাগবতের যুক্তরাষ্ট্র সফরকে কেন্দ্র করে ইউএসসিআইআরএফের এই আপত্তি ভারতীয় রাজনীতি ও দেশটির ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে চলমান আন্তর্জাতিক বিতর্ককে আবারও সামনে এনেছে।
আরএসএস ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সংগঠনটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আদর্শিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে সংগঠনটির ভূমিকা ও মতাদর্শ নিয়ে ভারতের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
মোহন ভাগবতের আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফর মূলত প্রবাসী হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে হলেও ইউএসসিআইআরএফের বক্তব্যের কারণে এটি এখন কূটনৈতিক ও মানবাধিকার বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
একদিকে ইউএসসিআইআরএফ আরএসএসের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে ভারত সরকার অতীতে কমিশনের এসব অভিযোগকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে ভাগবতের সফর ঘিরে দুই দেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার অবস্থানের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে।