প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়লেও এসব ঘটনায় করা ১০টি মামলার মধ্যে ছয়টির তদন্তে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এসব মামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক মাসে পরিত্যক্ত ব্যাগ, ছাতা কিংবা অন্যান্য স্থানে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা কয়েকটি বস্তু ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় করা মামলায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
মামলাগুলোর তদন্ত করছে থানা পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, দেশে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা অতীতেও ছিল এবং এখনো রয়েছে। অপরাধীরা সময়ের সঙ্গে কৌশল পরিবর্তন করায় গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য সূত্র বিশ্লেষণ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গত আট মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত নয়টি বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মতিঝিলের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর বোমাসদৃশ বস্তু, আশুলিয়ায় একটি দোকান থেকে প্রেশার কুকার বোমাসদৃশ বস্তু এবং সাভারে একটি মসজিদের মাঠ থেকে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে।
এ ছাড়া যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী ও সায়েদাবাদ এলাকায় পুলিশের তল্লাশি চৌকিকে কেন্দ্র করে বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার কয়েকটির তদন্তে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
যশোরের বাঘারপাড়ায় গত ৩১ জানুয়ারি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়। অভিযানের আগে মূল অভিযুক্ত পালিয়ে যাওয়ায় তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। মামলাটি পরবর্তীতে এটিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায়ও ছয় মাস পার হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তদন্ত কর্মকর্তারা বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। পুলিশের ধারণা, ঘটনার সঙ্গে উগ্রপন্থিদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
সায়েদাবাদের জনপথ মোড়ে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে বিস্ফোরণের মামলাতেও এখনো কোনো গ্রেপ্তার নেই। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে দেখা গেছে এবং তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
গত ২৪ জুলাই মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। সিটিটিসি এটিকে আইইডি হিসেবে উল্লেখ করে। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।
এর কয়েক দিন পর ৩০ জুলাই আশুলিয়ার একটি মুদি দোকান থেকে প্রেশার কুকার বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা মামলাটি বর্তমানে এটিইউ তদন্ত করছে। এখনো কোনো আসামিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
গত ১২ আগস্ট সাভারের সাদাপুর এলাকায় একটি মসজিদের মাঠ থেকে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায়ও অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করছেন।
সব মামলার পরিস্থিতি অবশ্য একই নয়। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে গত ২৬ ডিসেম্বর বিস্ফোরণের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই ঘটনায় একটি বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ও কয়েকটি বোমা উদ্ধার করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের মতে, ঘটনাটি বিস্ফোরক তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।
কুমিল্লার দক্ষিণ ঠাকুরপাড়ায় একটি মন্দির ও ব্র্যাক কার্যালয়ের সামনে বিস্ফোরণের ঘটনায়ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত এগিয়েছে।
এ ছাড়া সাভারে গত ১১ আগস্ট অভিযানে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, তার কাছ থেকে বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম ও বোমাসদৃশ বস্তুর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর ডেমরার সারুলিয়া এলাকায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের পর সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেছে এটিইউ।
পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে একাধিক ঘটনায় একই ধরনের আচরণ, পরিত্যক্ত ব্যাগ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের চলাফেরার বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, উগ্রবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের কেউ কেউ ছোট আকারের বিস্ফোরক বহনের জন্য ব্যাগ ব্যবহার করে থাকতে পারে। একই সঙ্গে বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ সংরক্ষণের তথ্যও তদন্তে পাওয়া যাচ্ছে।
তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ঘটনায় উগ্রবাদী সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কোনো গোষ্ঠীকে দায়ী করা যায় না। তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয়, উদ্দেশ্য ও সাংগঠনিক যোগাযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে একের পর এক বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের শনাক্ত করা এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি প্রতিরোধে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা জরুরি।