প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের ব্যাংক খাতে বহিঃনিরীক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অবাধ নিয়ন্ত্রণহীনতার মধ্যে চলছিল। নিরীক্ষক ফি নির্ধারণে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায়, নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে একরকম দরকষাকষি ও সমঝোতার ভিত্তিতে নিরীক্ষা ফি নির্ধারণ হয়ে আসছিল। এতে শুধু নিরীক্ষার নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছিল না, বরং দেশের আর্থিক খাত ও শেয়ারবাজারে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অবিশ্বাসও গড়ে উঠছিল। এই পরিস্থিতিতে অবশেষে নিরীক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)।
গতকাল বুধবার বহিঃনিরীক্ষকের ফি নির্ধারণ বিষয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, ব্যাংক কোম্পানির নিরীক্ষা ফি-এর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করা হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এফআরসির চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া। তিনি জানিয়েছেন, নিরীক্ষা ফি নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক উপাত্ত ও হিসাবের ভিত্তিতে এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং আজকের (বৃহস্পতিবার) মধ্যে নির্ধারিত সীমা ঘোষণা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘নিরীক্ষা ফি নির্ধারণের ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়মের অবসান ঘটবে এবং অডিটররা তাদের মতামত দিতে পারবেন স্বাধীনভাবে। এতে করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে নতুন করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।’’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ব্যাংক কোম্পানি বহিঃনিরীক্ষণ বিধিমালা, ২০২৪’ নামে একটি নির্দেশনা জারি করে, যেখানে ব্যাংকগুলোর আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষার জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম নিয়োগ এবং নিরীক্ষা ফি নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ ছিল। এই বিধিমালার আলোকে চলতি বছরের ১৮ জুন একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে এফআরসি, যার তত্ত্বাবধানে ছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং এফআরসির প্রতিনিধিরা।
এই কমিটি দেশে কার্যরত সব ব্যাংকের কাছে লিখিতভাবে জানতে চায়, একটি নিরীক্ষকের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ফি কত হওয়া উচিত এবং সর্বশেষ অর্থবছরে তারা নিরীক্ষা ফি বাবদ কত অর্থ প্রদান করেছে। পাশাপাশি প্রতিটি ব্যাংককে বলা হয়, নিরীক্ষা ফি নির্ধারণে তাদের মোট সম্পদ, মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ এবং মোট আমানতের ভিত্তিতে তথ্য প্রদান করতে।
কমিটি ব্যাংকগুলোর প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং সার্বিক আর্থিক বাস্তবতা ও পেশাগত মান বিবেচনায় নিয়ে নিরীক্ষা ফি-এর সীমা চূড়ান্ত করে। এফআরসি সূত্র জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে, নিরীক্ষকদের ওপর ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অযাচিত প্রভাব কমবে, নিরীক্ষার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হবে এবং অডিট রিপোর্টের গুণমানও বাড়বে।
বহু বছর ধরে শোনা যাচ্ছিল যে, কিছু কোম্পানি উচ্চ অঙ্কের ফি দিয়ে নিরীক্ষকদের কাছ থেকে আন কোয়ালিফায়েড মতামত আদায় করে নিত, যার ফলে বিনিয়োগকারীরা ভ্রান্ত ধারনার ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করতেন এবং পরবর্তীতে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হতেন। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে এমন অনেক নজির রয়েছে যেখানে আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ভালো থাকলেও, বাস্তবে তা ছিল ভিন্ন।
এই উদ্যোগ তাই শুধু ব্যাংক খাত নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের কর্পোরেট গভার্ন্যান্স ও আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে নিরীক্ষকদের পেশাদারিত্ব বাড়বে, নিরীক্ষা রিপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে আসবে এবং বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হবে আর্থিক খাত নিয়ে নতুন আস্থা।
এফআরসি ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, শুধু ব্যাংক নয়, অদূর ভবিষ্যতে অন্যান্য আর্থিক খাত যেমন বীমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষা ফি নির্ধারণেও উদ্যোগ নেওয়া হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের অডিট পেশা এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই ফি নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশের আর্থিক খাতে যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ সৃষ্টি হবে—তা শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেও অনেকখানি শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।










