৩১ দফা-ইশতেহার ছাপিয়ে বড় বিএনপির মন্ত্রিসভা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৭ বার

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিএনপি এতদিন ছোট ও কার্যকর মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলে এলেও সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার আকার দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা ১০ জন এবং বিশেষ সহকারী তিনজনসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন মোট ৬৪ জন। ফলে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে বর্তমান কাঠামোর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্ত্রিসভার আকার বড় হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে। আবার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব একজন মন্ত্রীর হাতে থাকলে কার্যকর নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে। বিপরীতে ছোট মন্ত্রণালয়ে একসঙ্গে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা দায়িত্ব পালন করলে তাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে প্রশাসনিক কাজের গতি কমার পাশাপাশি সময় ও অর্থের অপচয় হতে পারে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মন্ত্রিসভায় ২০ থেকে ২২ জন মন্ত্রী এবং আট থেকে ১০ জন প্রতিমন্ত্রী রাখা যৌক্তিক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

বর্তমান মন্ত্রিসভায় ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, বস্ত্র ও পাট এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের মতো তুলনামূলক ছোট মন্ত্রণালয়ে একজন করে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মতো ক্ষেত্রেও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা দায়িত্বে রয়েছেন।

এ ধরনের কাঠামো নিয়ে সমন্বয়ের প্রশ্নও উঠছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এবার দুজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি, ব্যস্ততা ও গতি আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় কাজের সুবিধার্থে দুজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা থেকে প্রতিমন্ত্রী হওয়া হুমায়ুন কবিরও এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।

সাবেক সচিব এবং জনপ্রশাসন সংস্কার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া বলেন, মন্ত্রীদের কাছে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ফাইল যায়; বাকি ফাইল নিচের পর্যায়েই নিষ্পত্তি হয়। তাঁর মতে, বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে বর্তমান সরকারি কাঠামোর মিল পাওয়া যাচ্ছে না। মন্ত্রীদের বক্তব্যেও সংস্কারের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

৩১ দফা ও ইশতেহারের সঙ্গে প্রশ্ন

বিএনপির ৩১ দফার চতুর্থ দফায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পুনর্বিন্যাস করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ হলো সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত না রেখে মন্ত্রিসভাকে নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশীদার করা। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রী নির্বাচন ও মন্ত্রণালয় বণ্টনে ব্যক্তিগত আনুগত্যের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও ‘মেরিটোক্রেসি’ বা মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে মন্ত্রিসভা গঠনের সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণের যোগ্যতা বিবেচনার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও বিএনপির প্রস্তাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, যোগ্য ও দক্ষ জনপ্রশাসন গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনার কথা রয়েছে। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও মন্ত্রীদের ইশতেহার অনুযায়ী দেশ পরিচালনার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, মন্ত্রিসভার আকার ছোট ও কার্যকর রাখা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হয়, জবাবদিহি বাড়ে এবং প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক নেতৃত্বের কার্যকর নজরদারি সহজ হয়। বড় মন্ত্রিসভায় অশুভ প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে বলেও তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি ছোট ও কার্যকর মন্ত্রিসভার কথা বললেও এখন পুরোনো পথেই হাঁটছে।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ছিল ৩৫ জনের

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রিসভায় সর্বোচ্চ ২৩ জন মন্ত্রী ও ১২ জন প্রতিমন্ত্রী রাখার সুপারিশ করেছিল। অর্থাৎ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৩৫ জনের কাঠামোর কথা বলা হয়েছিল।

কমিশন একই সঙ্গে বিদ্যমান ৪৩টি মন্ত্রণালয় কমিয়ে ২৫টি করার সুপারিশ করে। মন্ত্রণালয়গুলো পাঁচটি গুচ্ছে ভাগ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির সচিবালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বাদে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের জন্য দুজন টেকনোক্র্যাটসহ ২৩ জন মন্ত্রী এবং ১২ জন প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী রাখার প্রস্তাব ছিল।

সংস্কার কমিশনের সদস্যদের মতে, দেশের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় মন্ত্রীর সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা প্রয়োজন। ডিজিটাল যুগে একজন ব্যক্তি আগের তুলনায় বেশি কাজ করতে পারেন। তাই জনবল কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সুযোগ রাখার লক্ষ্যেই অপেক্ষাকৃত ছোট মন্ত্রিসভার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

আগের সরকারগুলোর তুলনায়

বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে সদস্য ৫১ জন। প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা ১০ জন এবং বিশেষ সহকারী তিনজনসহ মোট সংখ্যা ৬৪।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাথমিক মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ ৩৭ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরে আরও সাতজন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত হলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৪ জনে। উপদেষ্টা ছিলেন সাতজন।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী ছিলেন ৪৮ জন। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের পর প্রাথমিক মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ ৪৯ জন সদস্য ছিলেন, পরে তা বেড়ে ৫৪ জনে দাঁড়ায়।

২০০৮ সালের নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় শুরুতে প্রধানমন্ত্রীসহ ৩২ জন সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে সম্প্রসারণ ও রদবদলের পর সদস্যসংখ্যা ৬১ জনে দাঁড়ায়; উপদেষ্টাসহ মোট সংখ্যা ছিল ৭০।

২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় ৬০ জন সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে ২৮ জন মন্ত্রী, ২৮ জন প্রতিমন্ত্রী এবং চারজন উপমন্ত্রী ছিলেন। উপদেষ্টা ছিলেন চারজন।

অন্যদিকে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের অধীনে ১৫ জন উপদেষ্টা ও চারজন বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ২০ জন উপদেষ্টা এবং ১৩ জন বিশেষ সহকারী দায়িত্ব পালন করেন।

ফলে বিএনপির বর্তমান মন্ত্রিসভার আকারকে ছোট ও কার্যকর সরকারের পূর্বঘোষিত প্রতিশ্রুতি, ৩১ দফার ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের আলোকে নতুন করে মূল্যায়ন করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত