যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তি শুল্কে রপ্তানি খরচ বেড়েছে: আজ থেকে কার্যকর নতুন হার, চাপের মুখে বাংলাদেশের পোশাক খাত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট, ২০২৫
  • ৬২ বার

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের ওপর আজ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন শুল্কহার কার্যকর হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের সর্বশেষ ঘোষণার ভিত্তিতে আজ ৭ আগস্ট ২০২৫ থেকে বাংলাদেশি পণ্যে পূর্বের তুলনায় বেশি হারে শুল্ক দিতে হবে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে এক ঘোষণায় বাংলাদেশসহ একাধিক দেশের জন্য নতুন চূড়ান্ত শুল্কহার প্রকাশ করেন। ঘোষিত হার অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপর অতীতে আরোপিত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমিয়ে সেটিকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে এতে বাংলাদেশের জন্য বাস্তবিক আর্থিক স্বস্তি খুব একটা আসেনি, বরং শুল্কের সামগ্রিক কাঠামোয় জটিলতা এবং খরচের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এর আগে বাংলাদেশকে গড়ে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে শুল্ক দিতে হতো। কিন্তু নতুন ঘোষণার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকালে বাংলাদেশি পণ্যে এখন সর্বমোট ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিতে হতে পারে। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ (BGMEA) জানিয়েছে, এই হার পণ্যের ধরন অনুযায়ী বিভিন্নভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, তবে সার্বিকভাবে এটি রপ্তানিকারকদের জন্য একটি অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় একক বাজার। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গত এক দশক ধরেই ঘনিষ্ঠ এবং কার্যকর ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রভাবে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষত চীন ও ভারতের পর বাংলাদেশের ওপরও বড় ধরনের শুল্ক আরোপ মার্কিন বাণিজ্য নীতির একটি নতুন দিক নির্দেশ করছে।

বাংলাদেশ গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা বাংলাদেশি গার্মেন্ট রপ্তানির বিশাল একটি অংশ। সাম্প্রতিক শুল্ক বৃদ্ধির ফলে এই রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মূলত ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মেক্সিকো ও ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলক কম শুল্কে রপ্তানির সুবিধা পাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশি পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসায়ী মহল ও রপ্তানিকারকরা নতুন শুল্ক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিজিএমইএর প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে শুল্ক ছাড় এবং পুনর্বিবেচনার জন্য আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কারণ আমাদের শিল্পকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয়ভার বহন করতে হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে শ্রমিকদের মজুরি, রপ্তানির গতি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও।”

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই বাড়তি শুল্ক আরোপ দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি সুবিধা হারানোর সম্ভাবনা এবং এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়ায় নানা বাধা সামনে আসছে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাজারে এমন শুল্ক বৃদ্ধি রপ্তানিমুখী অর্থনীতির জন্য ঝুঁকির বার্তা বহন করছে।

এদিকে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই শুল্কহার পর্যালোচনার অনুরোধ জানানো হবে। যদিও এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুল্ক ছাড় বা পরবর্তীতে হার পুনর্বিবেচনার কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা পাওয়া যায়নি।

রপ্তানিকারকরা আশা করছেন, বাংলাদেশের শ্রমঘন শিল্প ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে মার্কিন প্রশাসন ভবিষ্যতে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই নতুন শুল্ক কাঠামো রপ্তানিকারক খাতকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলবে বলেই তারা মনে করছেন।

সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এই বাড়তি শুল্ক বাংলাদেশি পণ্যকে যে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে, তা এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ে ত্বরিত কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। দেশে তৈরি পোশাক খাতে লক্ষাধিক শ্রমিক এবং শত শত কারখানা এই বাজারে নির্ভরশীল হওয়ায় ভবিষ্যতের জন্য একটি নীতিগত ও কার্যকর কৌশল গ্রহণ এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত