পরিবেশ ও জ্বালানিতে বাংলাদেশকে ১২ মিলিয়ন ইউরো দেবে জার্মানি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৭ বার
পরিবেশ ও জ্বালানিতে বাংলাদেশকে ১২ মিলিয়ন ইউরো দেবে জার্মানি

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ম্যানগ্রোভ ও সামুদ্রিক সম্পদ সুরক্ষা এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বাংলাদেশকে মোট ১২ মিলিয়ন ইউরো অনুদান দিচ্ছে জার্মানি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং শিল্প ও আবাসিক খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-জার্মানি সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। ‘বেটার প্রটেকশন অব ম্যানগ্রোভস, সোয়াম্প ফরেস্টস অ্যান্ড মেরিন এরিয়াস (কানেক্ট)’ এবং ‘এনার্জি এফিশিয়েন্সি ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (ইই৪ডেভ)’ নামের প্রকল্প দুটির মাধ্যমে একদিকে উপকূলীয় ও সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় কাজ হবে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে অর্থনীতি ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব তৈরির চেষ্টা করা হবে।

সমঝোতা অনুযায়ী, ম্যানগ্রোভ, জলাভূমি ও সামুদ্রিক এলাকা সুরক্ষার জন্য নেওয়া CONNECT প্রকল্পে জার্মানি দেবে ৫ মিলিয়ন ইউরো। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৭১ কোটি ৫২ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মৎস্য অধিদপ্তর এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন অধিদপ্তর যৌথভাবে কাজ করবে।

বাংলাদেশের জন্য এই প্রকল্পের গুরুত্ব বিশেষভাবে উপকূলীয় অঞ্চল ও সেখানকার মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, এসব এলাকার ওপর নির্ভর করে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা। মাছ ধরা, কৃষি, নৌযান চলাচল এবং বিভিন্ন স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এসব প্রতিবেশব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

ম্যানগ্রোভ বন ও জলাভূমি উপকূলীয় এলাকাকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব থেকে রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এসব অঞ্চল অসংখ্য মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল। কিন্তু জনসংখ্যার চাপ, দূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা, অপরিকল্পিত ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব প্রতিবেশব্যবস্থা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ফলে শুধু বন বা জলাভূমি সংরক্ষণ নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

CONNECT প্রকল্পের আওতায় নির্বাচিত উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় সম্পদের সুরক্ষা, পুনরুদ্ধার এবং টেকসই ব্যবহার জোরদার করা হবে। পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জীবিকা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও প্রকল্পের আওতায় গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে প্রকল্পটি কেবল একটি সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ককে আরও টেকসই করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ পরিবেশের ক্ষতি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ে। এ কারণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সংরক্ষণ কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, জার্মানির দেওয়া মোট ১২ মিলিয়ন ইউরোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, ৭ মিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ১০০ কোটি ১২ লাখ টাকা, দেওয়া হবে ‘এনার্জি এফিশিয়েন্সি ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (ইই৪ডেভ)’ প্রকল্পে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)।

বাংলাদেশে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের অপচয় কমানোও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একটি ভবন, কারখানা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে একই কাজ কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে করা গেলে উৎপাদন খরচ কমে এবং জাতীয় পর্যায়েও বিদ্যুতের ওপর চাপ কমে।

ইই৪ডেভ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো সরকারি-বেসরকারি অংশীজনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিল্পকারখানা ও আবাসিক ভবনে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা উন্নত করা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর মান ও নীতিমালা বাস্তবায়নে সহায়তা দেওয়ার মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রকল্পটির আওতায় শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবন খাতেও শক্তি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন সরঞ্জামের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও বিদ্যুতের চাহিদা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে একদিকে ভোক্তার ব্যয় কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।

জ্বালানি দক্ষতার বিষয়টি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। একই পরিমাণ উৎপাদন বা সেবা দিতে যদি কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির ব্যবহারও কমতে পারে। ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সাশ্রয় অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের মতো দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ও জার্মানির উন্নয়ন সহযোগিতার ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৭২ সাল থেকে জার্মানি বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন খাতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। দীর্ঘ সময়ে দেশটি বাংলাদেশকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরোর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতার এই ধারাবাহিকতায় পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতার মতো বিষয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নতুন দুটি প্রকল্প তাই শুধু ১২ মিলিয়ন ইউরোর অনুদান পাওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও জড়িত। একদিকে উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা গেলে জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণ মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় সহায়তা মিলবে। অন্যদিকে শিল্প ও আবাসিক খাতে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো গেলে বিদ্যুতের অপচয় কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।

তবে প্রকল্প দুটির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে বাস্তবায়নের কার্যকারিতা, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। বিদেশি অনুদানের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করে দীর্ঘস্থায়ী সক্ষমতা তৈরি করা গেলে এর সুফল প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা থাকবে।

বিশেষ করে উপকূলীয় সম্পদ সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং জ্বালানি দক্ষতায় শিল্প ও ভবন মালিকদের বাস্তব সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে দুটি প্রকল্পই বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন যাত্রায় কার্যকর অবদান রাখতে পারে। পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে একই উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে জার্মানির এই নতুন সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত