প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নে চীনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ এখন আর কেবল আলোচনা বা সম্ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জে-১০সিইসহ মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট সংগ্রহের লক্ষ্যে একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হলে চলতি অর্থবছরেই প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হতে পারে; তা সম্ভব না হলে পরবর্তী অর্থবছরে বিষয়টি নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং বিভিন্ন ধরনের ইউএভি সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। জে-১০সিই ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার সংগ্রহের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটি আলোচনার মাধ্যমে একটি খসড়া চুক্তি তৈরি করেছে এবং সেটি প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তবে এখনো চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। একইভাবে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কতটি জে-১০সিই কিনবে, মোট ব্যয় কত হবে কিংবা কবে বিমানগুলো বাংলাদেশে পৌঁছাবে—এসব বিষয়ও চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেনি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২০ থেকে ২৪টি যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। ফলে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব সংখ্যাকে সম্ভাব্য হিসাব হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব বুঝতে হলে বিমানবাহিনীর বর্তমান সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চাহিদার দিকে তাকাতে হবে। একটি যুদ্ধবিমান সাধারণত কয়েক দশক ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে কেনা হয়। ফলে আজকের একটি প্রতিরক্ষা ক্রয় কেবল বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নয়, আগামী দুই বা তিন দশকের নিরাপত্তা পরিবেশ বিবেচনা করেও করা হয়।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বহরের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলনামূলক পুরোনো প্রজন্মের প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে এফ-৭ পরিবারের বিমান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। এসব বিমান তাদের সময়ের জন্য কার্যকর হলেও আধুনিক আকাশযুদ্ধের প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। উন্নত রাডার, সেন্সর, দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধব্যবস্থা এখন একটি আধুনিক বিমানবাহিনীর সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
এই জায়গাতেই জে-১০সিইকে ঘিরে বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টি সামনে আসে।
জে-১০সিই হলো চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। এটি একটি এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান, যা আকাশযুদ্ধের পাশাপাশি স্থল ও সামুদ্রিক লক্ষ্যবস্তুতে বিভিন্ন ধরনের মিশনে ব্যবহারের জন্য তৈরি। বিমানটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে আধুনিক এএসএ রাডার প্রযুক্তি, উন্নত সেন্সর এবং দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধের অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতার কথা বলা হয়।
আধুনিক আকাশযুদ্ধে যুদ্ধবিমান শুধু কাছাকাছি গিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করে না। দূর থেকে প্রতিপক্ষকে শনাক্ত করা, পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়া, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং নিরাপদ দূরত্ব থেকে অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে beyond-visual-range বা দৃশ্যসীমার বাইরে আকাশযুদ্ধের সক্ষমতা আধুনিক ফাইটার জেটের কার্যকারিতা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
জে-১০সিই নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের পেছনে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ওই সংঘাতে পাকিস্তান দাবি করেছিল, চীনা জে-১০ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে এবং সংঘাতের বিভিন্ন সামরিক দাবির স্বাধীন যাচাইও জটিল। তাই ওই ঘটনাকে জে-১০সিইর শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তবে বাস্তব সংঘাতে ব্যবহারের খবর বিমানটির প্রতি বিভিন্ন দেশের আগ্রহ বাড়িয়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
জে-১০সিইর সঙ্গে তুলনায় প্রায়ই ফ্রান্সের রাফালের নাম আসে। রাফাল একটি উন্নত ৪.৫ প্রজন্মের দ্বৈত ইঞ্জিনবিশিষ্ট যুদ্ধবিমান এবং এর দীর্ঘদিনের অপারেশনাল অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিমানটির উন্নত সেন্সর, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থা, অস্ত্র বহনের সক্ষমতা এবং বিভিন্ন ধরনের মিশনে ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে জে-১০সিই তুলনামূলক হালকা এক ইঞ্জিনের প্ল্যাটফর্ম।
দুই বিমানকে সরাসরি ‘কে ভালো’—এই একটি প্রশ্নে বিচার করা সামরিক বিশ্লেষণের জন্য যথেষ্ট নয়। যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা নির্ভর করে শুধু বিমানের প্রযুক্তির ওপর নয়; এর সঙ্গে ব্যবহৃত অস্ত্র, পাইলটের প্রশিক্ষণ, রাডার ও সেন্সর নেটওয়ার্ক, গোয়েন্দা তথ্য, এয়ারবর্ন আর্লি-ওয়ার্নিং ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, মেইনটেন্যান্স এবং কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত সরকারি নথি ও স্থানীয় প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০টি জে-১০সিই কেনার সম্ভাব্য পূর্ণ প্যাকেজের ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ৩০২ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে শুধু বিমান কেনার খরচ নয়, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, লজিস্টিকস, অবকাঠামো, বীমা, কর ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এই হিসাব এখনো চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি নয়।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে তাই একটি বিমানের ঘোষিত দাম দিয়ে প্রকৃত ব্যয় বিচার করা যায় না। বিমান কেনার পর বহু বছর ধরে স্পেয়ার পার্টস, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হয়। ফলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—দীর্ঘমেয়াদে কোন প্যাকেজটি অর্থের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্কও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গত কয়েক দশকে চীন বাংলাদেশকে যুদ্ধবিমান, নৌযান, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। ফলে চীনা প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর একটি বিদ্যমান প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো রয়েছে। নতুন যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে সেই অভিজ্ঞতা কিছু ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।
তবে শুধু আধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করলেই আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হয়ে যায় না। জে-১০সিই বাংলাদেশে যুক্ত হলে এর কার্যকারিতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে উন্নত রাডার নেটওয়ার্ক, স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত পাইলট ও প্রকৌশলী, পর্যাপ্ত অস্ত্র ও স্পেয়ার পার্টস এবং কার্যকর কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল কাঠামো প্রয়োজন হবে। যুদ্ধবিমানকে একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবেই ব্যবহার করতে হয়।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখা। দেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। কিন্তু শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার পাশাপাশি নিজস্ব আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতাও প্রয়োজন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে জে-১০সিই সংগ্রহের উদ্যোগকে বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি বাংলাদেশকে রাতারাতি সামরিক পরাশক্তিতে পরিণত করবে না, আবার কয়েকটি আধুনিক যুদ্ধবিমানকে ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই। বরং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পুরোনো প্রজন্মের যুদ্ধবিমাননির্ভর সক্ষমতা থেকে আধুনিক সেন্সর, উন্নত রাডার এবং দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধের প্রযুক্তির দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই উদ্যোগের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে কীভাবে এটি বাস্তবায়িত হয় তার ওপর। স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, বাস্তবসম্মত অর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নতুন যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না—এটি রাষ্ট্রীয় নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু শান্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থাকা এবং নিজের আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া পরস্পরবিরোধী নয়। জে-১০সিই কেনার সম্ভাব্য উদ্যোগ সেই ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিরক্ষা ভাবনারই একটি অংশ হতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও চুক্তির পরই অবশ্য বোঝা যাবে, বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার ভবিষ্যৎ কাঠামো ঠিক কোন পথে এগোচ্ছে।