প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপ থেকে ধীর কিন্তু দৃঢ়ভাবে সরে এসে স্থিতিশীলতার পথে পা ফেলেছে। রপ্তানিতে লক্ষণীয় প্রবৃদ্ধি, রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙার মধ্য দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকিং খাতে পুনরায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা—এই বছরগুলোর সাফল্যগুলোর সারমর্ম। তবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব আদায়ে গতি বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির ফলে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার যোগ্যতায় এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রের বদলে যাওয়া স্পষ্ট। দীর্ঘকাল ধরে চলা ডলার সংকট কাটিয়ে ব্যবসায়ীরা স্বাচ্ছন্দ্যে আমদানির এলসি খুলতে পারছেন, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বড় ভূমিকা রেখে চলেছে এবং বৈদেশিক লেনদেনে উদ্বৃত্ত দেখা যাচ্ছে। সরকারি ও ব্যাংকিং সূত্রে প্রকাশিত পরিসংখ্যানগুলোর আলোয় দেখা যায়, জুলাই মাসে রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্স উভয় ক্ষেত্রেই বিশাল উন্নতি হয়েছে; জুলাইয়ে রপ্তানি আয় রিপোর্ট করা হয়েছে ৪৭৭ কোটি পাঁচ লাখ ডলার এবং রেমিট্যান্স এসেছে ২৪৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের ৪৪.৪৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। আর বৈধ পথে প্রাপ্ত রেমিট্যান্সই গত অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে—সামগ্রিকভাবে তিন হাজার ৩২ কোটি ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে; সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছিয়েছে। ব্যয়ের চাপ ও পুরনো ঋণ শোধের পরও রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়াকে বিশ্লেষকরা উল্লেখযোগ্য উন্নতি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে ব্যালান্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্তের রিপোর্টও অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা একযোগে বলছেন যে এ পুনরুদ্ধার বড় কোনো একক সংস্কারের বদলে বাস্তবনীতির মাধ্যমে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনায় সম্ভব হয়েছে। প্রবীণ অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেছেন, প্রশাসনিক ও আর্থিক দৃঢ়তা ফেরাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে; ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ঋণ শ্রেণিকরণ সময়সীমায় পরিবর্তন এবং সংস্থাগুলোতে নিরীক্ষা এমন পদক্ষেপের মধ্যে গন্য। ব্যাংকগুলোর অপরিচিত ঋণদানের পদ্ধতি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা শুরু হওয়ায় অর্থপাচারের পথ বন্ধ হওয়া এবং জালিয়াতির সুযোগ সংকুচিত হয়েছে—ফলত: বৈধ রেমিট্যান্স আনা বেড়েছে।
বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার ফলে নিত্যপণ্যের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে; মূল্যস্ফীতি গত কয়েক মাসে পতনের পর সামান্য ওঠানামা করলেও জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮.৫৫ শতাংশ। মূলত খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা থাকার কারণে সাময়িকভাবে এটি বেড়েছে; সরকার আশা প্রকাশ করেছে যে বছরের শেষের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কার্যত পদক্ষেপ নিয়েছে, যদিও বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যানের মতে পুঁজিবাজার সংস্কারে নেওয়া টাস্কফোর্সটি হয়তো সময়সাপেক্ষ এবং অনভিপ্রেতভাবে জটিলতা সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে সরকারের ঋণ শোধের নীতিই এক বিস্ময়কর সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইআরডি’র তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সরকার রেকর্ড পরিমাণ ৪০৮ কোটি ৬৯ লাখ ডলার ঋণ পরিশোধ করেছে। এটা একটি বড় কৌশলগত ব্যবসা—নতুন ঋণগ্রহণ সীমিত রেখে পুরোনো ঋণ শোধে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীত কয়েক বছরে বড় প্রকল্পগ্রহণের সময় বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি; ফলে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং বর্তমান সরকার সেই বোঝা কমানোতে মনোনিবেশ করেছে।
তথ্যভিত্তিক এই পুনর্গঠনের এক উপযোগী ফল হলো মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিও—বর্তমান হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু আয় হয়েছে দুই হাজার আটশো বিশ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় বাড়তি। তবে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি খানিকটা কমে ৩.৯৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; কৃষি খাতে সল্প প্রবৃদ্ধি এবং শিল্প ও সেবা খাতে ভিন্নমাত্রার বৃদ্ধিই সামগ্রিক জিডিপি gতি প্রভাবিত করেছে। অর্থনীতিবিদরা ইঙ্গিত দেন যে প্রকৃত তথ্য প্রকাশই সরকারের নীতি; পুরনো কালে গড়া পরিসংখ্যান থেকে ভিন্ন মাপেই তিনি এখন বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করছেন।
কিন্তু সফলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। রাজস্ব আদায়ে শ্লথ গতি চলতি বাজেট বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের ফলাফল এখনও সন্তোষজনক নয়। বিনিয়োগ, বিশেষত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আশানুরূপ মাত্রায় বাড়েনি—যদিও সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকে নিট এফডিআই বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিরোধী দলের অসহযোগিতার কারণে বিনিয়োগের গতি সীমিত রয়ে গেছে; তবে ক্রমশ পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে কয়েক মাসের মধ্যে ফের বাড়তি বিনিয়োগে গতি ফেরার আশা করা হচ্ছে।
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা শুরু হলেও পলাতক হওয়া ও পাচার হওয়ার মতো মামলার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরানো এখনো সাফল্যের বাইরে। ব্যাংকিং খাতে কিছু সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠান একীভূত করার কাজ চলমান; দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত না হলে খাতের পূর্ণ স্বনির্ভরতা সময়সাপেক্ষ বলে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ মনে করেন। ঋণের সুদহারও প্রায় ১৬ শতাংশে স্থিত, যার কারণে শিল্পে বিনিয়োগে চাপ আছে—অর্থনীতিবিদদের একাংশ এখন সুদহার কমানো দাবি করছেন যাতে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী থাকায় শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়।
বিশ্লেষকদের সম্যক পরামর্শ হলো—বর্তমান ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আর্থিক খাতে অবশিষ্ট সংস্কারগুলো সম্পন্ন করলে দেশের অর্থনীতি পুনরায় গতিময় হয়ে উঠবে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স যে ছকটি স্থাপন করেছে, তা ধরে রাখতে নীতিগত ধারাবাহিকতা জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে কর প্রশাসনে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা আনা হলে চলতি বাজেট ও আর্থিক কাঠামো আরো শক্ত হবে।
এক diverted পথে ছন্দে ফিরে এসে অর্থনীতি এখন পুনরায় পুনর্গঠনের ধাপে আছে; সফলতার ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চূড়ান্ত স্থিতিশীলতা অর্জন করতে আরও সময় ও কার্যকর সংস্কারের প্রয়োজন। জনজীবন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা উন্নত করার চাবিকাঠি হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগের সুষ্ঠু প্রবাহ এবং দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। বর্তমান সরকারের হাত ধরে অর্থনীতির এই পুনর্জন্ম কেবল শুরু; এর বলিষ্ঠতা মাপার দায়িত্ব এখন নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী ও জনগণের একযোগে দায়িত্বশীলতায় নিহিত।