প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দিলে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ নিশ্চিত করলে তেহরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে সদ্য ঘোষিত ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ও বাতিল বা স্থগিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম চ্যানেল আল-এরাবিয়ার এক প্রতিবেদনে শীর্ষ এক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সম্প্রতি তেহরান সফরের সময় ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাব ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এমন প্রস্তাবের কথা নিশ্চিত করেনি।
আসিম মুনিরের তেহরান সফরে ইরানের বিভিন্ন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক হয়। এর মধ্যে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে তার বৈঠকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় পাকিস্তান, ওমান ও কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রস্তাবের মূল শর্ত হলো হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ করা। এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নতুন অর্থনৈতিক চাপের কর্মসূচি বাতিল এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর চলমান নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপ নিতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই জলপথে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্য বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে।
তবে তেহরান এখনো নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরান হরমুজ পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আগের সমঝোতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নসহ একাধিক শর্ত পূরণের দাবি করছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্ত মেনে না নিলে হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না।
ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নৌ-অবরোধের অবসান এবং সংঘাতের সামগ্রিক সমাধান। একই সঙ্গে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও আঞ্চলিক সংঘাতের অবসানের দাবিও তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র গত ২৪ আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক চাপ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের ঘোষিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতির অবশিষ্ট আন্তর্জাতিক সংযোগগুলো আরও সংকুচিত করা। এর আওতায় তেল, ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও শিপিং খাতকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
বেসেন্টের ঘোষণার পর ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোও মার্কিন চাপের মুখে পড়তে পারে। নতুন কর্মসূচির আওতায় ৬০টি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে একই সময়ে ইরানকে ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের তেহরান সফরের পাশাপাশি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কাতারের প্রধানমন্ত্রীও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এসব প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পথ তৈরি করা।
আসিম মুনিরের সফরের সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফেরার বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তেহরানকে এমন কোনো সমঝোতায় রাজি করানো, যাতে তারা নিজেদের কৌশলগত অবস্থানও ধরে রাখতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৭ আগস্ট বলেছেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে না এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে। একই সময়ে আঞ্চলিক দেশগুলো নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে।
চীনের অবস্থানও এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীন সেই সম্পর্ক কতটা বজায় রাখবে, তা ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপের কার্যকারিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হয়। ফলে এই নৌপথে স্থায়ীভাবে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস বাজারে চাপ কিছুটা কমতে পারে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তবে ওয়াশিংটনের কথিত নতুন প্রস্তাব এবং তেহরানের কঠোর শর্তের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে। ফলে পাকিস্তান, ওমান ও কাতারের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক আলোচনা এগোলেও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো কতটা সম্ভব হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।