প্রকাশ: ১০ অগাস্ট ‘২০২৫ । বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ঢাকা — চার মাস ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি কমার পর সাম্প্রতিক এক মাসে তা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও এটিকে স্বাভাবিক ওঠানামা হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। রোববার রাজধানীতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৩৬৫ দিন’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসবে—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
সেমিনারে গভর্নর জানান, দেশে মূল্যস্ফীতির ধারায় সামান্য ওঠানামা হওয়া স্বাভাবিক এবং দুই-তিন মাস কমার পর এক মাস বাড়ার ঘটনাকে অতিরিক্ত উদ্বেগের কারণ মনে করা উচিত নয়। তিনি বলেন, “ইনফ্লেশন কিছু কমেছে। আরও অনেক কমাতে হবে। প্রতি মাসেই যে কমবে—এই ধারণা করাটাও ভুল হবে। দুই মাস—তিন মাস কমবে, আবার এক মাস বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক।”
গভর্নর আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক আইন নবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যাতে আর্থিক খাত রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকে এবং কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা দুর্বৃত্তায়ন রোধ করা যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়বদ্ধতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অ্যামেন্ডমেন্ট অর্ডারও প্রস্তুত হচ্ছে বলে তিনি জানান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারে অভ্যন্তরীণ বাধা বা ‘ভেতরের শত্রু’ দমন করা হয়েছে এবং এখন রিপনμένων সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও টাকার ছাপায় উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “টাকা ছাপাতে ও ব্যবস্থাপনায় প্রতি বছর ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে থাকে। যদি ক্যাশলেস ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তাহলে এই ব্যয় অনেক কমে আসবে।”
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দেশের নগরায়ণের বাস্তবতা ও বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন, গ্রাম থেকে শহরে আগত মানুষ পুরোদমে গ্রামের দিকে ফিরে যাবে না; সুতরাং বস্তির মানুষকে হাউজিং ব্যবস্থায় আনতে হবে। বর্তমানে দেশে হাউজিং লোনের অংশ মাত্র চার শতাংশ; তিনি এটিকে কম বলে চিহ্নিত করে বললেন, “হাউজিং লোন কমপক্ষে ২০ শতাংশে নিতে হবে।” এই উদ্যোগকে তিনি বাসস্থান নিশ্চিতকরণ ও সমন্বিত শহরায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন।
ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রসারে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন গভর্নর। তিনি বলেন, ডিজিটাল সেবা গ্রাহকপ্রধান করতে হলে স্মার্টফোনের দাম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে নামাতে হবে এবং সাশ্রয়ী দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে—এ দুটির সমন্বয় দ্রুত ক্যাশলেস অর্থনীতিতে রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করবে। উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে দেশীয় অর্থনীতির অগ্রাধিকারে রাখার আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেন তিনি।
ক্রেডিট সংস্কৃতি প্রসঙ্গে গভর্নর জানান, দেশের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত—ভারতেরও এক তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম; এ ইঙ্গিতেই তিনি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের পরিসর বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়ার কথা উল্লেখ করেন। রিজ়ার্ভ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এই ধরনের উদ্যোগকে তিনি প্রয়োজনীয় মনে করেন।
সেমিনারে দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক, গবেষক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের অংশগ্রহণকারীরা চলমান নীতি, কর সংস্কার ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে প্রশ্ন-উত্তর করেন। গভর্নরের বর্ণিত আশা ও নীতিগত নির্দেশনা ফলপ্রসূ করার জন্য দ্রুত ও সমন্বিত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর বিশেষ জোর দেয় আশপাশের অংশগ্রহণকারীরা।
গভর্নরের মন্তব্যগুলো দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যয় দক্ষতা ও ডিজিটাল অর্থনীতির রূপান্তর—এই তিনটি অগ্রাধিকার বিষয়ের দিকে নীতিনির্ধারক ও পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।