প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, বৈষম্য কমানো এবং তরুণদের জন্য একটি কার্যকর ও ন্যায্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণের পথে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়ে পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়া, বিনিয়োগের স্থবিরতা, সরকারি নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণের শ্রমবাজারে প্রবেশের কারণে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।
সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ এবং বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিসংখ্যান দেশের শ্রমবাজারের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে না। কারণ চাকরি খুঁজতে খুঁজতে হতাশ হয়ে শ্রমবাজার থেকে সরে যাওয়া অনেক মানুষ সরকারি বেকারত্বের হিসাবের বাইরে থেকে যান। আবার অনেকে নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার তুলনায় অনেক কম মানের কাজে যুক্ত থাকলেও পরিসংখ্যানের হিসাবে তারা কর্মরত হিসেবে বিবেচিত হন।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করেন। বিপরীতে আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হয় প্রায় ৩ লাখের মতো। ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক নতুন গ্র্যাজুয়েট চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘ সময় কর্মসংস্থানের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
দীর্ঘদিন চাকরি না পাওয়ার এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু বর্তমান আয়ের ওপর পড়ে না, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের কারণে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ কমে যায় এবং পরবর্তী সময়ে চাকরি পেলেও প্রত্যাশিত আয় ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির সুযোগ সীমিত হতে পারে। তরুণদের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কর্মজীবনের শুরুতেই দীর্ঘ বিরতি তাদের আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদনের। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠলে বড় পরিসরে নতুন চাকরি সৃষ্টি করা কঠিন। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে, যা দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। একই সময়ে গ্যাসসংকট, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপের কারণে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে।
শিল্পাঞ্চলগুলোর চিত্রও উদ্বেগজনক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। একই সময়ে তৈরি পোশাক খাতেও শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। প্রথম ছয় মাসের তথ্য অনুযায়ী, বিজিএমইএর সদস্য অন্তত ৮০টি কারখানায় ১৯ হাজার ১৮৮ শ্রমিক চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও দীর্ঘ সময়ের হিসাবেও শিল্প খাতে সংকোচনের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি শিল্প ইউনিট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে পোশাক, নিটওয়্যার, বস্ত্র এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার অর্থ শুধু একজন মালিকের ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হাজারো শ্রমিক ও তাদের পরিবারের আয়-নিরাপত্তাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, দেশে বিনিয়োগ এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হচ্ছে অথবা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে একদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, অন্যদিকে বিদ্যমান চাকরিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তার মতে, বিনিয়োগ ও শিল্পের গতি না বাড়লে বেকারত্ব কমানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসানও শিল্প খাতে জ্বালানি অব্যবস্থাপনাকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরির মতো পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান অনেক কারখানাও ভবিষ্যতে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আগে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের আরেকটি বড় ক্ষেত্র সরকারি চাকরি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফ, ২০২৫’-এর খসড়া তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ১৯ লাখ ৮৬ হাজার পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। অর্থাৎ সরকারি খাতে প্রায় ৫ লাখ ২২ হাজার পদ শূন্য রয়েছে। অথচ এসব পদে নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী।
নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা তরুণদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। বিসিএস, ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি ও আধা-সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রাথমিক পরীক্ষা থেকে চূড়ান্ত সুপারিশ পর্যন্ত কয়েক বছর সময় লেগে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে একজন তরুণ যখন চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে বছরের পর বছর একই প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকেন, তখন তিনি বেসরকারি খাতেও স্বাভাবিকভাবে ক্যারিয়ার শুরু করার সুযোগ হারাতে পারেন।
দেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বিদেশি শ্রমবাজার এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৩৫০ কর্মী বিদেশে গেছেন। বাংলাদেশ বহু দেশে কর্মী পাঠালেও বাস্তবে কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতা বেশি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতার কারণে ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক বা সামরিক সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারেও তার প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি জাপান ও ইউরোপের সম্ভাবনাময় বাজারগুলোতে আরও জোর দিতে হবে। তবে এসব বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু শ্রমিক পাঠালেই হবে না; ভাষা, কারিগরি দক্ষতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সংকটের প্রভাব দারিদ্র্য ও জীবনযাত্রার ওপরও পড়ছে। সীমিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রম আয়ের দুর্বল প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল নিম্নআয়ের মানুষের কাছে প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না বলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে সতর্কতা এসেছে। আয় কমে যাওয়া এবং একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে পরিবারগুলোর ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে।
কর্মসংস্থানের এই সংকটের সামাজিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন বেকার থাকা তরুণদের একটি অংশ হতাশা, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে বেকারত্বের সরাসরি সম্পর্ক সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত না হলেও কর্মসংস্থানের অভাব যে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে তরুণদের সামনে বৈধ আয় ও সম্মানজনক জীবিকার পথ সংকুচিত হলে সামাজিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতা তৈরির আশঙ্কা বাড়ে।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বন্ধ ও রুগ্ণ কারখানা পুনরায় চালু, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন। সরকারি শূন্যপদগুলো স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর প্রয়োজনীয়তাও তারা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে নতুন বিদেশি শ্রমবাজার খুঁজে বের করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকে বাস্তব প্রকল্প, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে শিল্পভূমি ও বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া। শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেই হবে না, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে তরুণ, শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ যখন নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, তখন তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে বেকারত্বের চাপ আরও বাড়বে।
কর্মসংস্থান তাই শুধু অর্থনৈতিক সূচকের বিষয় নয়; এটি তরুণদের ভবিষ্যৎ, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিনিয়োগ ও শিল্পের গতি বাড়ানো, বিদ্যমান কর্মসংস্থান রক্ষা, সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা ও গতি আনা এবং বিদেশি শ্রমবাজার সম্প্রসারণ—এই সবগুলো ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা পূরণের বদলে প্রতিবছর নতুন করে বেকারত্বের চাপ বাড়তে থাকবে, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজ উভয়ের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।