ভেনিসে বাঁধনকে হেনস্তা, কড়া প্রতিবাদ সারজিসের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
ভেনিসে বাঁধনকে হেনস্তা, কড়া প্রতিবাদ সারজিসের

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইতালির ভেনিসে চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে বাংলাদেশের অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বাঁধনের নিজের দেওয়া ভিডিওবার্তায় এ ঘটনার কথা সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, একদল ব্যক্তি তার ওপর চড়াও হয়ে পানি ও ডিম ছুড়েছেন, গালাগাল করেছেন এবং তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছেন। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

ঘটনার পর বাঁধনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। সোমবার দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বাঁধনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে হেনস্তাকারীদের তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন।

সারজিস আলম তার পোস্টে বাঁধনকে উদ্দেশ করে বলেন, তিনি তাকে নিয়ে গর্বিত এবং দেশের মানুষের মুক্তির জন্য তার ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে যারা অভিনেত্রীর ওপর হামলা বা হেনস্তা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তাদের কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি। তবে সারজিসের পোস্টের ভাষায় রাজনৈতিক বক্তব্য ও ব্যক্তিগত মন্তব্যও ছিল, যা ঘটনাটিকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাঁধন নিজেই ঘটনার বিষয়ে একটি ভিডিওবার্তা প্রকাশ করে তার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভেনিসের একটি স্থানীয় পার্কে ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় কয়েকজন ব্যক্তি তার দিকে এগিয়ে আসেন এবং একপর্যায়ে তার ওপর হামলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় তার শরীরে কোক ও ডিম ছোড়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মোবাইল ফোনও ছুড়ে ফেলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বাঁধনের অভিযোগ, হামলাকারীরা তাকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ বলে উল্লেখ করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। একপর্যায়ে তাকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন। এ সময় তাকে গালাগালি করা হয়েছে বলেও ভিডিওবার্তায় অভিযোগ করেন অভিনেত্রী।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাঁধন বলেন, তার গায়ে হাত তোলা হয়েছে এবং তার ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। এমন আচরণ থেকে বের হয়ে আসার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাঁধনের ভিডিওবার্তায় আরও উঠে আসে, ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ও স্লোগানের বিষয়টি জড়িয়ে পড়েছিল। তিনি জানান, তাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে আক্রমণাত্মক আচরণ করা হয়েছে। এ নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি প্রশ্ন তোলেন এবং বিষয়টি যথাযথভাবে দেখার আহ্বান জানান।

ভিডিওবার্তায় বাঁধন ভেনিসে অবস্থানরত সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছেও বিষয়টি পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সজীব ওয়াজেদ জয়ও ওই সময় ভেনিসে অবস্থান করছিলেন। তবে ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে একদল ব্যক্তিকে বাঁধনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। ভিডিওগুলোর কিছু অংশে তাদের নিজেদের ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে এবং বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে শোনা যায়। কিছু ভিডিওতে তার দিকে পানি ও ডিম ছোড়ার দৃশ্যও দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা দাবি করেছেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সব বক্তব্য ও দৃশ্যের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভিডিওতে দেখা বা শোনা প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের ভিত্তিতে কারও ওপর হামলা বা হেনস্তার অভিযোগ থাকলে সেটিও যথাযথভাবে তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।

আজমেরী হক বাঁধন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিচিত মুখ। অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে তার প্রকাশ্য অবস্থানের কারণেও তিনি আলোচিত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় রাজপথে তার সক্রিয় উপস্থিতি এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচনায় আসে। তার সেই রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ভেনিসের সাম্প্রতিক ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্য ও ভিডিওতে সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উল্লেখ দেখা গেছে।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো একটি আয়োজনে বাংলাদেশের একজন শিল্পীর উপস্থিতির সময় এ ধরনের ঘটনার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি দেশের শিল্পী যখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন তার নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে বিদেশের মাটিতে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সংঘাত বা শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ উঠলে তা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাবমূর্তির প্রশ্নও সামনে আনে।

বাঁধন বর্তমানে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেত্রী এর আগেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র আয়োজনে বাংলাদেশের সিনেমা ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছেন। ফলে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বলে অভিযোগ করা ঘটনাটি নিয়ে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া। কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক বা সমালোচক—এটি তার ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অধিকারের অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই মতের কারণে তাকে হেনস্তা, অপমান বা শারীরিকভাবে আক্রমণের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে এমন ঘটনা ঘটলে তা আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

সারজিস আলমের বক্তব্যও ঘটনাটিকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তিনি বাঁধনের পাশে দাঁড়িয়ে হেনস্তাকারীদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তবে তার বক্তব্যে ব্যবহৃত কিছু শব্দ ও রাজনৈতিক মন্তব্য নিয়ে পৃথক বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি মূল ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

এ ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছিল, কারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং হামলা বা হেনস্তার অভিযোগের পেছনে কী ছিল—তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য যাচাই করে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব হতে পারে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসবে।

একই সঙ্গে এমন ঘটনায় ভুক্তভোগীর প্রতি মানবিক আচরণ এবং তার ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা অতীতের অবস্থানকে কেন্দ্র করে কাউকে প্রকাশ্যে অপমান বা হেনস্তা করা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভেনিসের এই ঘটনা তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর সঙ্গে কথিত দুর্ব্যবহারের বিষয় নয়; এটি মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক সহনশীলতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের নাগরিকদের আচরণ—সবকিছুকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ঘটনার বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসার অপেক্ষায় এখন সংশ্লিষ্ট মহল। অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হলে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিও কমবে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাও এ ঘটনা আবার সামনে এনেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত