হাসিনা ফিরলে জুলাই শহীদ পরিবারই প্রতিরোধ গড়বে: সারজিস

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
হাসিনা ফিরলে জুলাই শহীদ পরিবারই প্রতিরোধ গড়বে: সারজিস

প্রকাশ: ০৮  সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাইলে তাকে বিমানবন্দর থেকে ফাঁসির কাষ্ঠে নিয়ে যাওয়ার জন্য জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরাই যথেষ্ট। ঝালকাঠিতে দলীয় এক কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঝালকাঠি শহরে জাতীয় নাগরিক পার্টির জেলা শাখার আয়োজনে সাংগঠনিক সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালার শুরুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সারজিস আলম। এ সময় তিনি জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ, কষ্ট ও মানসিক আঘাতের কথা তুলে ধরেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর বক্তব্যের একই ধরনের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ উঠলে সারজিস আলম বলেন, তাঁকে ঠেকাতে আলাদাভাবে কাউকে কিছু করতে হবে না। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে স্বজন হারানো এবং আহতদের পরিবার এখনো সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পরিবারের সদস্যরা বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকলেই যথেষ্ট হবে। বক্তব্যে তিনি শেখ হাসিনার মৃত্যুর পর দাফনসহ কোনো বিষয়ই বাংলাদেশের মাটিতে হওয়ার সুযোগ থাকবে না বলেও কঠোর মন্তব্য করেন।

সারজিস আলমের বক্তব্যের মূল কেন্দ্র ছিল জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান। তিনি মনে করেন, আন্দোলনের সময় যারা স্বজন হারিয়েছেন কিংবা নিজেরা আহত হয়েছেন, তাঁদের ক্ষত এখনো শুকায়নি। ফলে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রসঙ্গে তাঁদের আবেগ ও প্রতিক্রিয়াকে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া কিংবা ভবিষ্যতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে সারজিস আলমের বক্তব্যকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তির বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দেশের প্রচলিত আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত। ফলে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং আইনগত সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিতর্ক ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিজেদের অবস্থান থেকে এসব পরিবারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। একই সঙ্গে আন্দোলনকেন্দ্রিক সহিংসতা, হতাহতের ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণের প্রশ্নও রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় রয়েছে।

ঝালকাঠির ওই কর্মসূচিতে সারজিস আলম শুধু শেখ হাসিনার প্রসঙ্গেই বক্তব্য দেননি। সরকারের বিভিন্ন কার্ডভিত্তিক সামাজিক সহায়তা প্রকল্প নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন ধরনের কার্ড চালুর পরিকল্পনা করা হলেও এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। শুধু কার্ড তৈরির জন্য ২৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সারজিস আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, জনগণের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হলে তার বাস্তবায়নযোগ্যতা, অর্থের উৎস এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারও পরবর্তী সময়ে জটিলতা বুঝতে পেরেছে। এ কারণে প্রকল্পটি নিয়ে আগের মতো আলোচনা নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর বক্তব্য, জনগণের অর্থে পরিচালিত কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সেটির প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য ব্যয় এবং প্রত্যাশিত ফলাফল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত। একই সঙ্গে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ছাড়া বড় ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প গ্রহণ করলে তা শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে তাঁর সমালোচনার মধ্য দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়েও একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এসেছে। নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে কার্ডভিত্তিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে সঠিক উপকারভোগী শনাক্তকরণ, তথ্যের নির্ভুলতা, অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর। রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে এসব বিষয় কার্যকরভাবে নিশ্চিত করাই যেকোনো সামাজিক সহায়তা প্রকল্পের সাফল্যের অন্যতম শর্ত।

ঝালকাঠির কর্মসূচিতে সারজিস আলমের বক্তব্য একই সঙ্গে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশের একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবেও দেখা হচ্ছে। একদিকে জুলাই আন্দোলনের নিহত ও আহতদের পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা, অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—দুই বিষয়ই জাতীয় রাজনীতিতে স্পর্শকাতর হয়ে রয়েছে। ফলে এ ধরনের বক্তব্য সাধারণ রাজনৈতিক মন্তব্যের বাইরে গিয়ে জনমনে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।

রাজনৈতিক বক্তব্য যতই কঠোর হোক, রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে আইন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একইভাবে জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকেও উপেক্ষা করা যায় না। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য স্বচ্ছ তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।

সারজিস আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাই শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার কঠোর মন্তব্য হিসেবে নয়, বরং জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিহত ও আহতদের পরিবারের অবস্থান, বিচারপ্রত্যাশা এবং ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে চলমান বিতর্কের অংশ হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবহার ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে তাঁর প্রশ্নগুলোও সরকারের নীতি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত