চট্টগ্রামের পিংক বাসে সেবার শুরুতেই নানা অভিযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৯ বার
চট্টগ্রামের পিংক বাসে সেবার শুরুতেই নানা অভিযোগ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম নগরে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে চালু করা বিআরটিসির পিংক বাস সার্ভিস এক মাস না পেরোতেই নানা অভিযোগের মুখে পড়েছে। নির্ধারিত রুট পুরোপুরি অনুসরণ না করা, নারী চালকের পরিবর্তে পুরুষ চালকের বাস পরিচালনা, পুরুষ যাত্রী ওঠানো এবং কর্মজীবী নারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পরিবহনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কারণে যে উদ্দেশ্যে এই বিশেষ বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছিল, সেটি কতটা পূরণ হচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের সামনে থেকে পিংক বাস সার্ভিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। বিআরটিসির উদ্যোগে চালু হওয়া এই সেবায় দুটি বাস যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ আসনের একটি দোতলা বাস কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটার এবং ৪৫ আসনের একটি একতলা বাস বালুছড়ার নতুনপাড়া থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত চলাচল করার কথা। দূরত্ব অনুযায়ী এসব বাসের ভাড়া ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের কর্মজীবী নারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নারী যাত্রীদের জন্য এই উদ্যোগকে শুরুতে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছিল। বিশেষ করে নগরের ব্যস্ত সড়কে নারীদের নিরাপদ যাতায়াত এবং গণপরিবহনে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিংক বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু চালুর অল্প সময়ের মধ্যেই বাসের পরিচালনা ও সেবা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসায় সেই প্রত্যাশা এখন কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে।

সম্প্রতি বাস দুটির চলাচল অনুসরণ করে দেখা গেছে, নির্ধারিত গন্তব্য পর্যন্ত না গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শেষ স্টেশনের আগেই বাস ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ নির্ধারিত রুটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নগরের সিইপিজেড এলাকা রয়েছে। চট্টগ্রামের তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষের যাতায়াত রয়েছে। ফলে পিংক বাসের মতো বিশেষ পরিবহন সেবার জন্য এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে বাস দুটির নিয়মিত চলাচল দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাস চলাচলের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও নজরে এসেছে। ৭৫ আসনের দোতলা বাসটিকে কালুরঘাটের প্রায় দুই কিলোমিটার আগে একটি মাদরাসার সামনে থামিয়ে শিক্ষার্থী তুলতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিয়মিতভাবেই ওই স্থান থেকে শিক্ষার্থীদের বাসে তোলা হচ্ছে। ফলে যে পরিবহন ব্যবস্থা মূলত নারীদের জন্য বিশেষভাবে চালু করা হয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের পরিবহন কেন অগ্রাধিকার পাচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাসের দায়িত্বশীলদের বক্তব্যেও যাত্রী সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। বাসটির সুপারভাইজার শীলা আক্তার জানিয়েছেন, শহরে নারী যাত্রীর সংকট থাকায় প্রতিদিন মাদরাসার শিক্ষার্থীদের বাসে তোলা হয়। তাদের সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে মায়েরাও থাকেন বলে তিনি জানান। তবে পর্যবেক্ষণের সময় একই বাসে পুরুষ যাত্রী ওঠার ঘটনাও দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ সেবায় কারা অগ্রাধিকার পাবেন, সেই নীতিমালা কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পিংক বাসের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো চালকের আসনে নারী থাকার কথা থাকলেও সেখানে পুরুষ চালকের দায়িত্ব পালন করা। বাসের চালক সুস্মিতা রানীর ভাষ্য অনুযায়ী, নারী চালকদের সঙ্গে একজন পুরুষ চালক রাখা হয়েছে। নগরের যেসব সড়কে দুই দিক থেকে যানবাহনের চাপ বেশি থাকে, সেসব স্থানে বাস চালানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রয়োজন হয় বলেই পুরুষ চালক রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে দিনের অধিকাংশ সময় পুরুষ চালক বাস চালানোর অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

অন্যদিকে বিআরটিসির পুরুষ চালক রাজু শেখ দাবি করেছেন, নারী চালকরা এখনও পুরোপুরি দক্ষ হয়ে ওঠেননি। এ কারণে বিআরটিসি তাকে সহযোগিতার জন্য দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি সব সময় বাস চালান না এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে মাঝেমধ্যে বাস পরিচালনা করেন বলে জানান।

বিআরটিসির এই বিশেষ বাস সার্ভিস নিয়ে চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পরিবহন শ্রমিকদের একাংশ অভিযোগ করেছেন, নারী চালকদের মাত্র তিন মাসের প্রশিক্ষণের পর ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক পুরুষ চালক ভারী যানবাহনের লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। তাদের দাবি, এতে পরিবহন খাতে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।

বাসচালক শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, তিনি ২০১৭ সালে হালকা মোটরযানের লাইসেন্স নিয়েছেন। দীর্ঘ সময় পার হলেও ভারী যানবাহনের লাইসেন্স পাননি এবং তার আবেদনও গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি। তার প্রশ্ন, একজন নারী চালক যদি স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে ভারী যানবাহনের লাইসেন্স পেতে পারেন, তাহলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পুরুষ চালকদের ক্ষেত্রে একই সুযোগ কেন থাকবে না।

তবে নারী চালকদের দক্ষতা নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটির পেছনে প্রশিক্ষণের মান, বাস্তব সড়কে চালানোর অভিজ্ঞতা এবং পর্যাপ্ত তদারকি—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে দোতলা বাসে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে চালকের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সরাসরি যাত্রী নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাই নারী বা পুরুষ—পরিচয় নয়, বরং প্রশিক্ষণ, দক্ষতা, লাইসেন্স এবং নিরাপদভাবে বাস পরিচালনার সক্ষমতাকেই মূল মানদণ্ড হিসেবে দেখা জরুরি।

এদিকে পিংক বাস দুর্ঘটনায় পড়ছে বলেও অভিযোগ করেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। কালুরঘাট সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল আবছার দাবি করেছেন, গত এক সপ্তাহে পিংক বাসের পাঁচটি দুর্ঘটনার তথ্য তারা পেয়েছেন। তার মতে, অদক্ষ চালকদের তড়িঘড়ি করে সড়কে নামানো উচিত হয়নি। তিনি মনে করেন, দক্ষ চালক হতে পর্যাপ্ত সময় ও বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

তবে এসব দুর্ঘটনার অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কিংবা প্রতিটি ঘটনার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও প্রকৃত পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

পিংক বাসের পরিচালন ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিআরটিসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দোতলা বাসটির প্রতিদিন প্রায় ২৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে চারজন কর্মীর খাবার এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে বাস দুটি লোকসানে চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে বিআরটিসি চট্টগ্রাম বাস ডিপোর অপারেশন ম্যানেজার কামরুজ্জামান বলেছেন, বাস সার্ভিসে লোকসান হচ্ছে কি না, তা তার জানা নেই।

তিনি বলেন, নারী চালকদের বাড়ি চট্টগ্রামের বাইরে হওয়ায় তারা নগরের সড়কগুলো এখনও ভালোভাবে চিনে উঠতে পারেননি। তাদের সহায়তার জন্য পুরুষ চালক রাখা হয়েছে। নারী চালকরা পর্যাপ্ত দক্ষ হয়ে উঠলে পুরুষ চালকের প্রয়োজন থাকবে না বলেও তিনি জানান।

শিক্ষার্থী পরিবহনের অভিযোগ প্রসঙ্গে কামরুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থী যদি ছাত্রী হন, তাহলে তারা বাসে উঠতে পারবেন। পুরুষ যাত্রী পরিবহনের অভিযোগও তিনি সঠিক নয় বলে দাবি করেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বাস দুটি পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরীফ উদ্দিন জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন বাস সার্ভিসটির উদ্বোধন করেছে, কিন্তু এটি পরিচালনার দায়িত্ব বিআরটিসির। ফলে বাস পরিচালনায় কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে সে বিষয়ে বিআরটিসিই বক্তব্য দিতে পারবে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রামের মতো একটি বড় নগরে নারীদের জন্য আলাদা গণপরিবহন চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবী নারী, পোশাকশ্রমিক, শিক্ষার্থী কিংবা প্রতিদিন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করা নারীদের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা তাদের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করতে পারে। কিন্তু সেই সেবা যদি নির্ধারিত রুটে নিয়মিত না চলে, গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান এলাকায় না পৌঁছায় কিংবা যাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষ করে সিইপিজেডের মতো এলাকায় নিয়মিত পিংক বাস চলাচল নিশ্চিত করা গেলে কর্মজীবী নারীদের একটি বড় অংশ এর সুবিধা পেতে পারেন। একইভাবে নারী চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে তাদের পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে এই সেবার মূল উদ্দেশ্যও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে।

পিংক বাস সার্ভিসের শুরুতেই উঠে আসা অভিযোগগুলো তাই শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থার পরিচালনাগত ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার কার্যকারিতা, যাত্রী নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণের মান এবং সরকারি সেবার তদারকি—সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ধারিত রুটে নিয়মিত বাস পরিচালনা, যাত্রীদের অগ্রাধিকার নীতিমালা স্পষ্ট করা এবং চালকদের দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রামে পিংক বাস সার্ভিস তার কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এই বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে কাগজে-কলমে কতটি বাস চালু হয়েছে তার ওপর নয়; বরং প্রতিদিন একজন কর্মজীবী নারী তার কর্মস্থলে সময়মতো, নিরাপদে এবং স্বস্তিতে পৌঁছাতে পারছেন কি না—তার ওপর। চট্টগ্রামের নারীদের সেই প্রত্যাশা পূরণে পিংক বাস সার্ভিসকে আরও পরিকল্পিত, নিয়মিত ও কার্যকর করে তোলাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত