প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মতিঝিলের দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে গ্রাহক ফোরামের সদস্য ও চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। সোমবার সকালে ব্যাংকের সামনে পৃথক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ মুখোমুখি হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম।
পুলিশ জানিয়েছে, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে ব্যাংকের সামনে অবস্থান নিতে গেলে সেখানে আগে থেকেই গ্রাহক ফোরামের একটি কর্মসূচি চলছিল। দুই পক্ষ মুখোমুখি হওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ব্যাংকের সামনে এমন সংঘর্ষের ঘটনায় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি আশপাশের ব্যবসায়ী, পথচারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়। মতিঝিল রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় সকালবেলার কর্মব্যস্ত সময়ে ব্যাংকের সামনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় সাময়িকভাবে সেখানে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং ব্যাংকটিতে এস আলমের প্রভাবের প্রতিবাদে তাদের কর্মসূচি ছিল। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল আয়োজন করা হয়।
ফোরামের দাবি, কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর আগে থেকে সেখানে অবস্থান করা চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ তাদের ওপর হামলা চালায়। সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, ওই ব্যক্তিরা ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের লক্ষ্য করে হামলা চালান। এতে ফোরামের সহসভাপতি ও ব্যবসায়ী মোতাছিম বিল্লাহসহ অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে গ্রাহক ফোরাম। তবে আহতদের সবার আঘাতের ধরন বা তাদের চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবিতে ব্যাংকের সামনে এসেছিলেন। তাদের কর্মসূচি এবং গ্রাহক ফোরামের কর্মসূচি একই স্থানে হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এরপরই মারামারির ঘটনা ঘটে।
মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। গ্রাহক ফোরাম দাবি করছে, তাদের কর্মসূচিতে হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্যে মূলত দুই পক্ষের কর্মসূচি একই স্থানে হওয়া এবং মুখোমুখি অবস্থানের পর উত্তেজনা ও মারামারির কথা বলা হয়েছে। ফলে সংঘর্ষের পুরো ঘটনার জন্য কারা প্রথমে হামলা করেছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো বিস্তারিত তথ্য এখনো সামনে আসেনি।
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে গত কয়েক বছর ধরে মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ, ঋণ বিতরণ, ব্যবস্থাপনা এবং সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। ব্যাংকটির গ্রাহকদের একটি অংশ এসব বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি হারানো ও পুনর্বহালের দাবিও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
সোমবারের কর্মসূচিতে গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলা হয়। পাশাপাশি ব্যাংকের ওপর কথিত প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদ জানানো হয়। তাদের বক্তব্যে ব্যাংকের আমানতকারী, শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
একটি ব্যাংকের সামনে এমন সংঘর্ষের ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকের গ্রাহক ও আমানতকারীদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির স্থিতিশীলতা ও সেবার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসূচি বা প্রতিবাদের নামে ব্যাংকের কার্যক্রম ব্যাহত হলে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তির আশঙ্কা থাকে। একইভাবে চাকরিচ্যুত কর্মীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির অধিকারও রয়েছে। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে উভয় পক্ষের বক্তব্য ও দাবিকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে।
সোমবারের ঘটনার পর ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর এলাকায় স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসে। তবে সংঘর্ষের ঘটনায় কেউ আটক বা গ্রেপ্তার হয়েছে কি না, কিংবা কোনো পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে আহতের যে সংখ্যা জানানো হয়েছে, সেটিও সংগঠনটির নিজস্ব দাবি হিসেবে এসেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে চূড়ান্তভাবে কতজন আহত হয়েছেন, তা সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হতে পারে।
ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি যেন আর উত্তপ্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা। ব্যাংকের সামনে যেকোনো কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে একই ধরনের পরিস্থিতি আবারও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে মতিঝিলের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকায় এমন সংঘর্ষ সাধারণ মানুষের চলাচল এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনর্বহালের দাবি এবং গ্রাহক ফোরামের ব্যাংক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপত্তি—দুটি বিষয়ই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আলাদাভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। তবে কোনো দাবির সমাধানই সংঘর্ষ বা সহিংসতার মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়। অভিযোগ থাকলে তা আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করাই দীর্ঘমেয়াদে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য নিরাপদ পথ।
সোমবার সকালে ইসলামী ব্যাংকের সামনে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ তাই শুধু একটি তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ঘটনা নয়; এটি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকদের আস্থা, চাকরিচ্যুত কর্মীদের ভবিষ্যৎ এবং ব্যাংকের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে চলমান নানা প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংঘর্ষে কার কী ভূমিকা ছিল এবং আহতদের বিষয়ে পরবর্তী তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর আপাতত স্বাভাবিক রয়েছে মতিঝিলের দিলকুশা এলাকার পরিবেশ। তবে ভবিষ্যতে একই ধরনের কর্মসূচি ঘিরে যাতে উত্তেজনা বা সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।