চড়া দামে সার বিক্রির অভিযোগে রাজিবপুরে কৃষকদের বিক্ষোভ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩২ বার
চড়া দামে সার বিক্রির অভিযোগে রাজিবপুরে কৃষকদের বিক্ষোভ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন কৃষকেরা। উপজেলার শিবেরডাঙ্গী বাজারে দুই বিসিআইসি ডিলারের বিরুদ্ধে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রির অভিযোগ ওঠার পর কৃষকেরা প্রতিবাদে জড়ো হন। একই সময়ে অন্য একটি ডিলারের গোডাউন থেকে সার লুটের অভিযোগের ঘটনাও এলাকায় উত্তেজনা তৈরি করেছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দামে প্রতি বস্তা সার ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রির কথা থাকলেও শিবেরডাঙ্গী বাজারে ‘মেসার্স সার ঘর’ ও ‘মেসার্স আমিনা এন্টারপ্রাইজ’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই সার ১ হাজার ৭৩০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ৩৮০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে বলে কৃষকেরা দাবি করেছেন। কৃষকদের ভাষ্য, সারের সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করায় তাঁদের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

বুধবার শিবেরডাঙ্গী বাজারে এ পরিস্থিতি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি চলছিল। কৃষকেরা প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্য হয়ে বেশি দাম দিয়ে সার কিনছিলেন। প্রায় ১০০ বস্তা সার বিক্রি হওয়ার পর উপস্থিত কৃষকেরা একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ডিলাররা পরে সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি শুরু করেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

কৃষকদের অভিযোগের মূল কেন্দ্রে রয়েছে সার পাওয়ার অনিশ্চয়তা। কৃষি মৌসুমে সময়মতো সার না পেলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়া কিংবা বাড়তি টাকা দিয়ে সার কেনার পরিস্থিতি কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। বিশেষ করে আগাম ভুট্টা চাষকে কেন্দ্র করে অনেক কৃষক একসঙ্গে সার সংগ্রহ করতে আসায় বাজারে চাপ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ প্রসঙ্গে ‘মেসার্স সার ঘর’-এর স্বত্বাধিকারী আব্দুল হাই বলেন, এলাকার সারের ঘাটতি পূরণের উদ্দেশ্যে তিনি এবং ‘মেসার্স আমিনা এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক আসাদ চট্টগ্রাম থেকে এক ট্রাক সার কিনে এনেছিলেন। তাঁর দাবি, সার বিক্রির সময় হঠাৎ করে উপস্থিত জনতা চাপ সৃষ্টি করে এবং ট্রাক থেকে সার নিয়ে যায়। তবে কৃষকদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এদিকে, সার বিতরণে অনিয়ম ও বিলম্বের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ‘মেসার্স শফিউর এন্টারপ্রাইজ’ নামের আরেক ডিলারের গোডাউন থেকেও সার লুটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই গোডাউন থেকে আনুমানিক ২৫০ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে ঠিক কত বস্তা সার সরানো হয়েছে এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ডিলার শফিউর রহমান শফির দাবি, তাঁর নিজ বাড়ির গোডাউন থেকেই সার বিক্রি করা হচ্ছিল। দোকানের সামনে কৃষকদের দীর্ঘ লাইন ছিল। তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে একদল লোক দোকানের দরজা ভেঙে কিছু সার নিয়ে যায় বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরে কিছু বস্তা সার উদ্ধার করে ফেরত পাওয়া গেছে এবং অবশিষ্ট সার উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

সারের দাম ও বিতরণ নিয়ে একদিকে কৃষকদের অভিযোগ, অন্যদিকে গোডাউন থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কৃষকদের একটি অংশের দাবি, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তাঁরা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবশালী বা পরিচিত ব্যক্তিরা অপেক্ষাকৃত সহজে সার পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে সাধারণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

জাউনিয়ার চর লম্বাপাড়া গ্রামের কৃষক বাবুল আক্তার বলেন, তিনি এবং তাঁর গ্রামের অনেক কৃষক ভোর ৪টা থেকেই সারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সাধারণ কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার দেওয়া হয়নি। বরং পেছনের দরজা দিয়ে কিছু সুবিধাভোগীকে সার দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রকৃত কৃষকেরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পরিস্থিতির প্রতিবাদে কৃষকেরা পরে ঝাড়ু ও লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। তাঁদের প্রধান দাবি ছিল, সার বিতরণে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল করা। বিক্ষোভকারীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের অভিযোগ তুলে ধরেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

কৃষকদের এই বিক্ষোভে শুধু সারের দাম নয়, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায্য বণ্টনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। কৃষকদের বক্তব্য, কৃষি উৎপাদনের মৌসুমে সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা। তাঁদের অনেকেরই বাড়তি দামে সার কেনার সক্ষমতা নেই। ফলে নির্ধারিত দামে সময়মতো সার পাওয়া তাঁদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চর রাজিবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তুহিন জানান, অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে ‘মেসার্স শফিউর এন্টারপ্রাইজকে’ কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর দাবি, এলাকায় সারের প্রকৃত সংকট নেই। আগাম ভুট্টা চাষের জন্য কৃষকেরা একযোগে সার সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সাময়িকভাবে চাহিদার চাপ তৈরি হয়েছে। প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

সারের সংকট নেই—কৃষি কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতার কিছুটা পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কৃষকদের দাবি, বাস্তবে তাঁদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও তা সঠিকভাবে বিতরণ হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে চর রাজিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুর আলম জানান, সার লুটের চেষ্টা করা হয়েছিল। খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও জানান তিনি। ফলে সার বিতরণ নিয়ে তৈরি হওয়া উত্তেজনা আপাতত নিয়ন্ত্রণে এলেও অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রয়েছে কৃষকদের মধ্যে।

চর রাজিবপুরের এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, কৃষি উপকরণের বাজারে সরবরাহ ও ন্যায্য বণ্টন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একজন কৃষকের কাছে এক বস্তা সারের বাড়তি কয়েকশ টাকা শুধু অতিরিক্ত ব্যয় নয়; মৌসুমের শুরুতেই তা তাঁর পুরো উৎপাদন খরচের হিসাব বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা ছোট পরিসরে চাষাবাদ করেন, তাঁদের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় ফসল বিক্রির পর লাভের পরিমাণও কমিয়ে দিতে পারে।

এ অবস্থায় কৃষকদের প্রত্যাশা, সারের সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণের বিষয়টি প্রশাসন কঠোরভাবে নজরদারি করবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রকৃত কৃষকের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে সার লুটের মতো আইনবিরোধী ঘটনাও বন্ধ হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

সারের দাম, সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য কৃষক, ডিলার, কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। কারণ কৃষকের উৎপাদন নির্ভর করে সময়মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ পাওয়ার ওপর। সার নিয়ে অনিয়ম বা অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু একটি বাজার বা কয়েকজন কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; শেষ পর্যন্ত তা পুরো কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত