প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থীদের গুপ্ত রাজনীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের যারা গুপ্ত রাজনীতিতে উৎসাহিত করে, তারা কখনো তাদের ভালো চায় না; বরং নিজেদের স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতে চায়।
বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের উদ্যোগে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবনসংলগ্ন মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক নবীন শিক্ষার্থী অংশ নেন। বিভিন্ন সূত্রে প্রায় দুই হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর উপস্থিতির কথা জানা গেছে।
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রাকিব বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতেই তাঁদের সতর্কভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। কেউ যদি তাঁদের গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা অনৈতিক কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং প্রয়োজনে সেই অবস্থানের বিরোধিতা করার আহ্বান জানান তিনি। এমনকি তাঁর নিজের সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও যদি শিক্ষার্থীদের গুপ্ত রাজনীতি বা ‘নোংরামি’ করতে উৎসাহিত করে, সেক্ষেত্রে ছাত্রদলের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
রাকিবের বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে নিজেদের শিক্ষা, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ানো উচিত নয়, যা তাঁদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়কে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সেটিই তাঁদের ভবিষ্যৎ পথচলায় বড় ভূমিকা রাখবে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
নবীন শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন ছাত্রদল সভাপতি। তিনি বিসিএস ক্যাডার হওয়াকেই জীবনের একমাত্র সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা না করার পরামর্শ দেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, বিসিএস ক্যাডার হতে না পারলে জীবন, পরিবার বা ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। চাকরি ও পেশাজীবনের ক্ষেত্রে দেশে সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও ব্যাপক সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের কর্মসংস্থানের উদাহরণ তুলে ধরে রাকিব বলেন, দেশের গার্মেন্টস খাতে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশ থেকেও অনেকে বাংলাদেশে এসে এই খাতে কাজ করছেন এবং তাঁদের বেতন ও ক্যারিয়ারের অবস্থানও ভালো পর্যায়ে রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন পেশা ও দক্ষতার ক্ষেত্র বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। বক্তব্যে তিনি তরুণ শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, রোবটিক্স, ন্যানোটেকনোলজি এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তরুণ প্রজন্মের জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব কাজে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পরিবর্তনশীল বিশ্বের কর্মবাজারে টিকে থাকতে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীনও বক্তব্য দেন। তিনি নবীন শিক্ষার্থীদের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দর্শন ধারণ করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে দেশপ্রেম ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব এবং পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে দেশপ্রেমের শিক্ষা গ্রহণের কথা বলেন।
উপাচার্যের বক্তব্যের আরেকটি অংশে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করা হয়। তিনি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের রাকিবকে অনুসরণ করার আহ্বান জানান বলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানের মূল পর্বে শিক্ষা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রত্যাশার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।
অনুষ্ঠানে মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
নবীনবরণ অনুষ্ঠানটি শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়। নতুন পরিবেশ, নতুন সহপাঠী এবং নতুন শিক্ষাজীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবার সুযোগ পান শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থী তাঁদের অনুভূতি ও বিশ্ববিদ্যালয়জীবন নিয়ে প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থীদের এই আগমন তাঁদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীদের সামনে যেমন উচ্চশিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। এ সময়ে বিভিন্ন সংগঠন, মতাদর্শ ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে শিক্ষাজীবনের সঙ্গে অন্যান্য কর্মকাণ্ডের ভারসাম্য রক্ষা করা নবীনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রাকিবুল ইসলাম রাকিবের বক্তব্যে মূলত সেই জায়গাটিই গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বার্থ, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—কোনো সংগঠন বা রাজনৈতিক পক্ষ শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইলে তাদের তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এমনকি নিজের সংগঠনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত বলে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন। নবীন শিক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানাতে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উপহার ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এতে নবীনদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, নৈতিকতা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের মতো বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসে। ছাত্রদল সভাপতির বক্তব্যে গুপ্ত রাজনীতি থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান যেমন ছিল, তেমনি বিসিএসের বাইরেও পেশাগত জীবনের বিস্তৃত সুযোগ বিবেচনার পরামর্শও ছিল। আর শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে গুরুত্ব পায় প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন। ফলে নবীন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতেই শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তাই অনুষ্ঠানের আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে।