প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, বিমান চলাচল, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব বিষয় সামনে রেখে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত এইচ.ই. জঁ-মার্ক সেরে-শার্লের সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়। আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অগ্রাধিকার বিষয়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বহুপক্ষীয় অংশীদারিত্বের মতো ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান ও সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ানোর যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, ফ্রান্সের সঙ্গে বৈঠকটিও সেই ধারার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে জুলাইয়ে ফ্রান্সসহ পাঁচটি ইউরোপীয় দেশের রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের সঙ্গে হুমায়ুন কবীরের বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয় উঠে এসেছিল।
এবারের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে ফরাসি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মহাকাশ, প্রযুক্তি ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতকে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে এসব খাতে আরও বেশি ফরাসি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং শিল্পভিত্তি সম্প্রসারণের সঙ্গে এসব খাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও জ্ঞান স্থানান্তরের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাত বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। দেশে সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সম্প্রসারণও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দৃশ্যমান হয়েছে। ফলে ফ্রান্সের মতো প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নত দেশের বিনিয়োগ বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর এবং আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নে সম্ভাব্য সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়েও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সুযোগ ইতোমধ্যে রয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ফরাসি রাষ্ট্রদূত জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার বিভিন্ন সুযোগের কথা তুলে ধরেন।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ফরাসি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থার যৌথ কার্যক্রমও ভবিষ্যতে জ্ঞানভিত্তিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে।
বৈঠকে প্রতিরক্ষা ও বিমান চলাচল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাম্প্রতিক আলোচনায় বেসামরিক বিমান চলাচল একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে। এর ফলে বিমান পরিবহন, উড়োজাহাজ প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইনি পথে কর্মী অভিবাসনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়মিত অভিবাসন ও মানব পাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জিরো-টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। অভিবাসন ইস্যুটি শুধু কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে মানবিক নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার, নিরাপদ অভিবাসন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ও জড়িত। বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ হলে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার জন্য ফ্রান্সের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি বৈঠকে উঠে আসে। পাশাপাশি তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে দুই পক্ষের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবস্থান মানবিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত নানা চাপ তৈরি করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাবেও দেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৩ লাখের কাছাকাছি বা তার বেশি বলে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফ্রান্সও অতীতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ১১টি দেশের কূটনৈতিক মিশন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং সংকটের মূল কারণ মোকাবিলায় আরও কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছিল।
এ কারণে বাংলাদেশ-ফ্রান্স আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুর উপস্থিতি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মানবিক দিকটিও সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের প্রত্যাশা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অংশীদাররা শুধু জরুরি মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেই নয়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম হওয়ায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে দেশটির সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্স জলবায়ু ও পরিবেশগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় একটি দেশ। ফলে জলবায়ু অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অর্থায়নের মতো ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর ও ফরাসি রাষ্ট্রদূত জঁ-মার্ক সেরে-শার্লের বৈঠকে বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা উঠে এসেছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা, বিমান চলাচল, শিক্ষা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও রোহিঙ্গা সংকট—বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকের মাধ্যমে উভয় পক্ষ পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এসব আলোচনাকে বাস্তব প্রকল্প, বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সহযোগিতায় রূপ দেওয়া। আর ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রযুক্তি, শিক্ষা ও জলবায়ু ইস্যুতে নতুন ক্ষেত্র তৈরি হলে তা দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক করার সুযোগ তৈরি করতে পারে