প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টাঙ্গাইলের সখীপুরে পারিবারিক বিরোধের জেরে এক শিশু সন্তানকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার মায়ের বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় ওই নারীর আগের স্বামীর মেয়ে এক কিশোরীও গুরুতর আহত হয়েছে। নিহত শিশুর বাবা বাদী হয়ে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে একমাত্র আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। ঘটনার পর অভিযুক্ত নারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত শিশুর নাম আশরাফুল ইসলাম। ঘটনাটি ঘটেছে সখীপুর উপজেলার বড়চওনা ইউনিয়নের দেবরাজ গ্রামের খালিয়ার বাইদ পূর্বপাড়া এলাকায়। আহত কিশোরীর নাম সিদরাতুল। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে নিহত আশরাফুলের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে বাড়িতে পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে শিশু আশরাফুল ও সিদরাতুলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার ঘটনা ঘটে। এতে দুজনই গুরুতর আহত হয়। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা তাদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। রাত প্রায় ২টার দিকে আশরাফুলকে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শিশুটির মা আকলিমা আক্তারকে স্বজন ও প্রতিবেশীরা আটক করেন। স্থানীয়দের একাংশ তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখেন বলে জানা গেছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
একই ঘটনায় আহত সিদরাতুলের অবস্থাও গুরুতর বলে জানা গেছে। তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত আশরাফুলের সঙ্গে আহত সিদরাতুলের পারিবারিক সম্পর্ক নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। জানা গেছে, সিদরাতুল অভিযুক্ত আকলিমা আক্তারের আগের স্বামীর মেয়ে। অর্থাৎ শিশুটির সঙ্গে তার একই মায়ের সম্পর্ক থাকলেও পারিবারিক কাঠামোটি ছিল জটিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আশরাফুলের বাবা শাহীন মিয়া প্রায় ২৫ বছর আগে নাছিমা আক্তারকে প্রথম বিয়ে করেন। দীর্ঘ সময় সংসার করলেও তাঁদের কোনো সন্তান হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান। পরে নাছিমার সম্মতিতে শাহীন মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন আকলিমা আক্তারকে। বিয়ের পর দুই স্ত্রী পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করতেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আকলিমার আগের স্বামীর মেয়ে সিদরাতুলকে নাছিমা আক্তার দীর্ঘদিন ধরে লালন-পালন করতেন। এই বিষয়টি আকলিমা আক্তার ভালোভাবে নিতেন না বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন। সিদরাতুলকে ঘিরে দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন সময় মনোমালিন্য ও বিরোধ তৈরি হতো বলেও তাঁরা দাবি করেন। এসব পারিবারিক বিরোধের ধারাবাহিকতায় বুধবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
তবে পারিবারিক বিরোধের ঠিক কোন পর্যায়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং কী কারণে শিশু ও কিশোরীর ওপর হামলা করা হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো তদন্ত করছে। তাই স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে আসা কারণগুলোকে তদন্তে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও হামলার পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিহত শিশুর বাবা শাহীন মিয়া এ ঘটনায় বাদী হয়ে সখীপুর থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী আকলিমা আক্তারকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যাচাই করা হচ্ছে।
সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুরাদ হোসেন জানিয়েছেন, শিশুকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় আকলিমা আক্তারকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর রাতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের অন্যান্য তথ্য মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে আহত কিশোরীর চিকিৎসা ও তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে।
একটি শিশুর এমন মৃত্যু স্থানীয় মানুষের মধ্যেও গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। যে বাড়িতে পারিবারিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন জীবনের নানা টানাপোড়েনের মধ্যে শিশুটি বেড়ে উঠছিল, সেই পারিবারিক পরিবেশই শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই ঘটনায় আরেক কিশোরী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নয়, বরং একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, বিরোধ এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা কখনো কখনো শিশুদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার পেছনে মানসিক, পারিবারিক বা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত পটভূমি বের করা জরুরি।
এ ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—পারিবারিক কলহ যখন তীব্র হয়, তখন শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা অনেক সময় ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের বিরোধের প্রভাব যেন কোনোভাবেই শিশুদের জীবনে প্রাণঘাতী হয়ে না ওঠে, সে জন্য পারিবারিক পর্যায়ে সতর্কতা ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বজন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে সখীপুরের এ ঘটনার ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল, কার ভূমিকা কতটা ছিল এবং হত্যার অভিযোগের পেছনে প্রকৃত কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। অভিযুক্ত নারী বর্তমানে পুলিশের হেফাজত পেরিয়ে আদালতের নির্দেশে কারাগারে রয়েছেন। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য, আলামত ও ময়নাতদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।
ঘটনার পর নিহত শিশুর পরিবারের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের কাছে একটি শিশুর আকস্মিক মৃত্যু যেমন গভীর বেদনার, তেমনি আহত কিশোরীর চিকিৎসা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয়রাও চান, ঘটনার প্রকৃত সত্য দ্রুত বেরিয়ে আসুক এবং যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি, ব্যবহৃত অস্ত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, পারিবারিক বিরোধের পটভূমি এবং আহত কিশোরীর ওপর হামলার কারণসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় যাচাই করা। একই সঙ্গে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে শিশুটির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া হবে।
সখীপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, পারিবারিক বিরোধের প্রভাব কখনো কখনো সবচেয়ে অসহায় সদস্যদের জীবনেও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে বিরোধ নিরসন এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।