মাদকের ছোবলে ঝুঁকিতে নারীর জীবন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৯ বার
মাদকের ছোবলে ঝুঁকিতে নারীর জীবন

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে মাদকের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের একটি অংশের মাদকাসক্তি ও মাদক কারবারে সম্পৃক্ততার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। অসৎ সঙ্গ, প্রেম বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রভাব, স্বামী কিংবা পরিচিতজনের প্ররোচনা, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা এবং নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে কিছু নারী ধীরে ধীরে মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। শিক্ষার্থী, গৃহিণী, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার নারীদের মধ্যেও এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাদকে জড়িয়ে পড়লেও সামাজিক সংকোচ, পারিবারিক বাধা এবং চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক নারী প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে দূরে থাকছেন। ফলে তাদের আসক্তি একপর্যায়ে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে পাঁচ লাখের বেশি নারী কোনো না কোনোভাবে মাদকচক্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের একটি অংশ মাদক সেবনের পাশাপাশি বেচাকেনা, পরিবহন কিংবা সরবরাহের মতো কর্মকাণ্ডেও যুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের আওতায় মাদকাসক্ত, মাদক বহনকারী ও ব্যবসায় জড়িত নারীদের অবস্থান কীভাবে আলাদা করা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে জানা জরুরি। কারণ মাদক সমস্যাকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে আসক্তি ও অপরাধে সম্পৃক্ততার ধরন আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নারী মাদক বিক্রেতা ও বাহকের উপস্থিতির কথাও উঠে এসেছে। হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মিরপুর-১০, মগবাজার, কড়াইল বস্তি ও বাড্ডাসহ কয়েকটি এলাকায় নারীদের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ ও কেনাবেচার অভিযোগের কথা জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক কারবারিরা নারীদের সামাজিক অবস্থান ও তল্লাশির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের এক মাদক কারবারির বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগের তুলনায় বর্তমানে নারীদের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ ও কেনাবেচার ঘটনা বেশি চোখে পড়ছে। তার দাবি, ক্রেতাদের একটি অংশ নারী বিক্রেতাকে তুলনামূলকভাবে বিশ্বাসযোগ্য ও নিরাপদ মনে করে। একই সঙ্গে নারীদের চলাচলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাদক এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

আফতাবনগর এলাকার এক নারী, যার পরিচয় প্রতিবেদনে ছদ্মনামে প্রকাশ করা হয়েছে, জানান, তিনি আগে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি করা হয় এবং সন্ধ্যার পর ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়ে। ক্রেতাদের মধ্যে নারী ও পুরুষ উভয়ই থাকলেও তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য বলে তিনি জানান।

এ ধরনের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, মাদক ব্যবসা শুধু নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণি বা বয়সের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ, আবাসিক এলাকা কিংবা শ্রমজীবী মানুষের বসতিতেও মাদকের বিস্তার ঘটতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মাদকের সহজলভ্যতা তৈরি হলে এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।

নারীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। কারণ একজন নারী মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে তার নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি পরিবার ও সন্তানদের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করে। সামাজিক অপমান বা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয় না। ফলে আসক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

মাদকাসক্তির পেছনে পারিবারিক পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ, সম্পর্কের ভাঙন, একাকিত্ব, মানসিক চাপ, আর্থিক সংকট কিংবা নিরাপত্তাহীনতার মতো পরিস্থিতিতে কেউ কেউ মাদকের প্রতি ঝুঁকে পড়তে পারেন। আবার বন্ধু বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমেও প্রথমবার মাদক গ্রহণের ঘটনা ঘটতে পারে। শুরুতে কৌতূহল বা বিনোদনের অংশ হিসেবে নেওয়া মাদক পরবর্তী সময়ে নির্ভরশীলতায় রূপ নেওয়ার আশঙ্কা থাকে।

নারীদের মধ্যে ইয়াবা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্তির কথাও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এসেছে। মাদকের ধরন যাই হোক, নিয়মিত সেবনের ফলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে মাদক সংগ্রহের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতেও পড়েন।

অন্যদিকে মাদকচক্রের জন্য নারীকে ব্যবহার করার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও একটি বিশেষ চ্যালেঞ্জ। বড় চালানকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবহন করা হয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে নারী ও শিশুদের ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। নারীকে তল্লাশির ক্ষেত্রে নারী পুলিশ সদস্যের প্রয়োজন হওয়ায় কিছু অপরাধী চক্র সেই বাস্তবতাকে নিজেদের সুবিধায় ব্যবহারের চেষ্টা করে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদীর বক্তব্য অনুযায়ী, নারীদের প্রতি সামাজিকভাবে যে আস্থার জায়গা রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে কিছু মাদক ব্যবসায়ী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বড় চালান ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নারীদের মাধ্যমে পরিবহন ও পাচার করা হয়। শিশুদেরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় বলে তিনি জানান। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মাদক প্রতিরোধে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ একজন নারী যদি ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন, তাহলে তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে একই ব্যক্তি পুনরায় মাদকচক্রে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। পরিবারের কোনো নারী সদস্যের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সমস্যার বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগে হঠাৎ পরিবর্তন কিংবা মাদক গ্রহণের কোনো লক্ষণ দেখা গেলে বিষয়টি গোপন না রেখে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া জরুরি। তবে সহায়তার নামে অপমান, নির্যাতন বা সামাজিকভাবে হেয় করা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের মাদকচক্রে সম্পৃক্ততা ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা নারী ও তরুণদের জন্য সহজে পাওয়া যায় এমন পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ শুধু বহনকারী বা খুচরা বিক্রেতাকে আটক করলে পুরো সরবরাহব্যবস্থা বন্ধ করা সম্ভব নয়।

নারীদের মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি পরিবার, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি জটিল সংকট। একজন নারী মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার আগেই যদি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ তার পাশে দাঁড়াতে পারে, তাহলে অনেক জীবন বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব। আর যারা ইতোমধ্যে আসক্ত হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য প্রয়োজন শাস্তির পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ। মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াইয়ে এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত