ন্যায্যমূল্যে সার ও ফসলের দাম চান তানোরের কৃষক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২১ বার
ন্যায্যমূল্যে সার ও ফসলের দাম চান তানোরের কৃষক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহীর তানোরে সারসংকট নিরসন, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় কৃষক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কৃষি উপকরণের মূল্য ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তানোর থানা মোড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার কৃষক আন্দোলনের ব্যানারে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। বক্তারা বলেন, কৃষিকাজে সময়মতো প্রয়োজনীয় সার পাওয়া না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ থাকলে তা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কৃষকদের বক্তব্যে উঠে আসে, ফসল উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে কৃষককে নানা ধরনের ব্যয় বহন করতে হয়। জমি প্রস্তুত করা, বীজ সংগ্রহ, সার ও কীটনাশক কেনা, সেচ দেওয়া এবং শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ—সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ ক্রমেই বাড়ছে। এর বিপরীতে উৎপাদিত ফসল বিক্রির সময় কৃষক যদি কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পান, তাহলে পুরো মৌসুমের পরিশ্রম ও বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তানোরের কৃষকেরা তাই শুধু সার পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়, ফসল বিক্রির ক্ষেত্রেও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে কৃষিকাজে আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ফসলের দাম কমে যাওয়ার চাপ সামলানো আরও কঠিন।

মানববন্ধনে কৃষকদের পক্ষ থেকে সার সরবরাহে অনিয়ম এবং উচ্চমূল্যে সার বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা মনে করেন, কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী কৃষি উপকরণ সরবরাহের ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সংকটের আশঙ্কা কমানো সম্ভব।

কৃষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কৃষকরা মাঠে ফসল উৎপাদন করলেও অনেক সময় বাজারে গিয়ে তারা নিজেদের পণ্যের দামের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহন ব্যয়, সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বাজারের চাহিদা-জোগানের পরিবর্তনের কারণে উৎপাদক পর্যায়ে পাওয়া দাম ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ন্যায্য লাভ বিবেচনায় রেখে বাজারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা কৃষকদের বৈষম্য ও বঞ্চনা দূর করতে কৃষি খাতে কার্যকর নজরদারি ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তাদের মতে, শুধু নীতিমালা গ্রহণ করলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে সেই নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কৃষি উপকরণের সরবরাহ, মূল্য নির্ধারণ এবং বাজারে ফসলের দামের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

কর্মসূচিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার কৃষক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহমুদ জামাল কাদরী, সংগঠনের অন্যতম সদস্য ওসমান গনি এবং তানোর আঞ্চলিক শাখার সদস্যসচিব আজাহার উদ্দিনসহ স্থানীয় কৃষকেরা উপস্থিত ছিলেন। তারা কৃষকের স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

মানববন্ধন শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের সারসংকটের অভিযোগকে সামনে আনেনি; এর মধ্য দিয়ে কৃষকের দীর্ঘদিনের নানা সমস্যাও উঠে এসেছে। কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের কাছে উৎপাদন খরচ ও ফসলের বিক্রয়মূল্যের সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একদিকে সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের দাম ও প্রাপ্যতা, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের বাজারদর—এই দুইয়ের ওপর কৃষকের আয় অনেকাংশে নির্ভর করে।

তানোরের মতো কৃষিনির্ভর এলাকায় কৃষকের আয়-ব্যয়ের এই ভারসাম্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষকের উৎপাদন কার্যক্রম শুধু একটি পরিবারের আয়ের উৎস নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় শ্রমবাজার, পরিবহন, কৃষি উপকরণ ব্যবসা এবং খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাও যুক্ত। কৃষক উৎপাদন করতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিপরীতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে কিংবা ফসলের দাম কমে গেলে তার প্রভাব কৃষকের পরিবার ছাড়িয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

কৃষকদের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষকের কাছে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে সেটিও দূর করার সুযোগ তৈরি হবে। কৃষকের প্রয়োজনের সময় কৃষি উপকরণ না পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে তা পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে তার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। তাই কৃষি মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ফসলের ন্যায্যমূল্যের বিষয়টিও কৃষকের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কৃষক যখন উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখন পরবর্তী মৌসুমে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এতে কৃষকের ঋণনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই উৎপাদন ব্যয়, বাজার পরিস্থিতি এবং কৃষকের ন্যায্য লাভ বিবেচনায় নিয়ে কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার দাবি দীর্ঘদিনের।

মানববন্ধন শেষে কৃষকদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। স্মারকলিপিতে সারসংকট নিরসন, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ, কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, স্মারকলিপিতে উত্থাপিত দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। তাদের মতে, কৃষকের সমস্যার সমাধান শুধু কৃষকের স্বার্থ রক্ষার বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত।

কৃষকরা মাঠে উৎপাদন করেন বলেই মানুষের ঘরে খাদ্য পৌঁছায়। অথচ উৎপাদনের শুরু থেকে ফসল বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যদি তাদের অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে কৃষির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই কৃষকের জন্য প্রয়োজনীয় সার ও অন্যান্য উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, ন্যায্য মূল্য এবং বাজারে উৎপাদিত ফসলের যথাযথ দাম নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

তানোরের মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় কৃষকেরা মূলত এমন একটি কৃষিব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন, যেখানে উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ সময়মতো ও নির্ধারিত মূল্যে পাওয়া যাবে এবং ফসল ঘরে তোলার পর তার ন্যায্য মূল্যও নিশ্চিত হবে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা। কৃষকের এই দাবিগুলো কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদন পরিকল্পনা ও আগামী দিনের প্রত্যাশার একটি বড় অংশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত