প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, নিকেতন ও ধানমন্ডি এলাকার লেকগুলোকে দূষণমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লেকের পানিতে ভাসমান বর্জ্য অপসারণে বর্তমানে ব্যবহৃত যান্ত্রিক নৌকার সংখ্যা দুইটি থেকে বাড়িয়ে ১০টিতে উন্নীত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে লেকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশ বন্ধ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, তলদেশে জমে থাকা স্লাজ অপসারণ এবং স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপি স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ বৈঠকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ লেকগুলোর বর্তমান অবস্থা, দূষণের উৎস এবং সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্ব করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থাপনায় লেকগুলোর দূষণ নিয়ন্ত্রণে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ও উঠে আসে।
রাজধানীর লেকগুলো নগরজীবনে শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়; বরং বৃষ্টির পানি ধারণ, জলাবদ্ধতা কমানো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের অবসর কাটানোর ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন ও অপরিকল্পিত সংযোগের কারণে এসব জলাধারের ওপর পরিবেশগত চাপ বাড়ছে। ফলে শুধু পানির ওপর ভাসমান আবর্জনা সরিয়ে ফেললেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না—দূষণের উৎস বন্ধ করার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার লেকগুলোর দূষণের উৎস নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়। সেখানে গুলশান লেকে পয়ঃবর্জ্য প্রবেশের জন্য ছয়টি প্রাথমিক ও ছয়টি মাধ্যমিক পয়েন্ট চিহ্নিত করার কথা জানানো হয়। এসব সংযোগের মাধ্যমে দূষিত পানি বা পয়ঃবর্জ্য লেকের পানিতে প্রবেশ করছে কি না, তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পয়ঃনিষ্কাশন লাইন কোথাও বৃষ্টির পানির ড্রেন বা সরাসরি লেকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেলে তা বন্ধে ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনার বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পায়। এর পাশাপাশি ভবনভিত্তিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
লেক পরিষ্কারের ক্ষেত্রে ভাসমান বর্জ্য দ্রুত অপসারণকে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণে বর্তমানে যে দুইটি যান্ত্রিক নৌকা দিয়ে ভাসমান আবর্জনা সরানোর কাজ চলছে, সেটি বাড়িয়ে ১০টি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে একই সময়ে একাধিক লেকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং নিয়মিতভাবে ভাসমান বর্জ্য অপসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে লেকের ওপরের অংশ পরিষ্কার করার পাশাপাশি তলদেশে জমে থাকা স্লাজ বা দীর্ঘদিনের কাদা ও পলি অপসারণের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ভাসমান এক্সক্যাভেটর ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা স্লাজ লেকের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি তলদেশের জমাট বর্জ্য অপসারণকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ধানমন্ডি লেকের সংস্কার ও স্লাজ অপসারণের অগ্রগতিও বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে চলমান পাইলট প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। একই সঙ্গে লেকগুলোর পানির গুণগত মান উন্নত করতে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ানোর জন্য এরেটর স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দুর্গন্ধ কমাতে জৈবিক ও রাসায়নিক পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
লেক রক্ষায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে দীর্ঘমেয়াদি স্যানিটেশন ব্যবস্থা। শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা যান্ত্রিক নৌকা দিয়ে নিয়মিত বর্জ্য সরিয়ে ফেললে দূষণের মূল কারণ দূর হবে না। তাই পয়ঃবর্জ্য যাতে লেকে প্রবেশের সুযোগ না পায়, সে জন্য স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের জরিপ, অবৈধ সংযোগ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযোজ্য ভবনগুলোতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসটিপি স্থাপনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
রাজধানীর লেকগুলো ঘিরে পরিবেশ ও জনজীবনের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। লেকের পানি দূষিত হলে শুধু জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা, হাঁটাচলা, বিনোদন এবং নগর পরিবেশও প্রভাবিত হতে পারে। দুর্গন্ধ ও ময়লা-আবর্জনার কারণে অনেক লেকের আশপাশের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। তাই লেক পরিষ্কার রাখার উদ্যোগকে শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প হিসেবে না দেখে নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
বৈঠকে রাজউকের আওতাধীন লেকগুলোর সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪২ জন জনবল নিয়ে পাঁচটি বিশেষ টিম নিয়োজিত থাকার বিষয়টিও জানানো হয়। এসব টিমের কার্যক্রমের মাধ্যমে লেকগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ আরও সুসংগঠিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
লেক রক্ষায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন, নগর পরিকল্পনা এবং লেকের রক্ষণাবেক্ষণ—এসব কাজ একাধিক সংস্থার দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে একটি সংস্থার একক উদ্যোগের বদলে ঢাকা ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম চালানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নৌকার সংখ্যা দুই থেকে ১০টিতে বাড়ানোর নির্দেশনা তাই রাজধানীর লেক পরিষ্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান সক্ষমতা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ। তবে লেকের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত উন্নয়ন নির্ভর করবে দূষণের উৎস বন্ধ করা, পয়ঃবর্জ্যের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, নিয়মিত স্লাজ অপসারণ, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ জলাধারগুলোকে আরও পরিচ্ছন্ন, ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।