ঢাবি নিয়ে ফজলুর রহমানের মন্তব্য ঘিরে আলোচনা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৮ বার
ঢাবি নিয়ে ফজলুর রহমানের মন্তব্য ঘিরে আলোচনা

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সিনিয়র মাদরাসা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে মন্তব্য করেছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক নবীনবরণ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। একই বক্তব্যে তিনি শিক্ষা, ধর্ম, রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরাম আয়োজিত নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফজলুর রহমান। অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি জ্ঞান অর্জন, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ অনুসরণের আহ্বান জানান।

বক্তব্যের একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত এবং তার ভাষ্য অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে ‘সিনিয়র মাদরাসায়’ পরিণত হয়েছে। তিনি শিক্ষার্থীদের এ ধরনের পথে না যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পোশাক বা ভাষা দিয়ে একজন মানুষের জ্ঞান, যোগ্যতা কিংবা ধর্মীয় মর্যাদা নির্ধারণ করা যায় না।

ধর্মীয় জ্ঞান ও ব্যক্তিগত আচরণের প্রসঙ্গ টেনে ফজলুর রহমান বলেন, পাঞ্জাবি, পায়জামা বা টুপি পরলেই কেউ আলিম হয়ে যান না; এর জন্য প্রকৃত জ্ঞান অর্জন প্রয়োজন। তিনি ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা ও আচরণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।

তার বক্তব্যে রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, দেশে কখনো কখনো বেহেশত-দোজখের মতো ধর্মীয় ধারণাকে ব্যবহার করে মানুষের কাছে এক ধরনের ‘টিকিট’ বিক্রির চেষ্টা করা হয় এবং কেউ তা গ্রহণ করতে না চাইলে তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি রাজনীতি, ধর্ম এবং ধর্মকে ব্যবসায়িকভাবে ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করার আহ্বান জানান।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি সত্য বলা, ন্যায়ের পথে চলা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ অনুসরণের কথা বলেন। তবে একই সঙ্গে ধর্মকে ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার না করার কথাও উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যে ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আলাদা রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

ফজলুর রহমানের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সাম্প্রদায়িকতা ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তার মতামত। তিনি সাম্প্রদায়িকতাকে ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য ক্ষতিকর একটি আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তার ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের মধ্যে বিভাজন দূর করে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চিন্তা ও সাহিত্যকর্মের কথাও তুলে ধরেন। নজরুলের লেখায় অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা ও সাম্যের যে বার্তা রয়েছে, তা বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যে নজরুলের চেতনাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ফজলুর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে অসাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি গভীরভাবে সম্পর্কিত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম এগিয়ে যায়। তিনি নজরুলকে সত্যবাদী ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তার চিন্তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কথাও বলেন।

নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পরিবেশ ও ব্যক্তিগত বিকাশের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য নবীনবরণ অনুষ্ঠান সাধারণত তাদের নতুন শিক্ষাজীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি করে। এমন আয়োজনে শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক ও বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিদের বক্তব্য শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নানা দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার খন্দকার নাজমুল হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম বেগম, কিশোরগঞ্জ জেলা পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব এবং সদস্য সচিব মামুন সরকার। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলফারুন নাহার রুমা। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মো. নিজাম উদ্দিন।

নবীনবরণ পর্ব শেষ হওয়ার পর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়ধ্বনি মঞ্চে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। ফলে দিনব্যাপী আয়োজনটি নবীন শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক পরিচিতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মিলনমেলার রূপ নেয়।

ফজলুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে করা মন্তব্যটি এরই মধ্যে শিক্ষাঙ্গন ও রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী, শিক্ষা পরিবেশ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক ভূমিকা নিয়ে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিতে পারে। তবে এ ধরনের মন্তব্যের অর্থ ও প্রেক্ষাপট মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

তার বক্তব্যে একই সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধ, শিক্ষার উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অসাম্প্রদায়িকতার মতো বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। ফলে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মন্তব্যের মধ্যেই তার বক্তব্য সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কী ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত, সে বিষয়েও তিনি নিজের মতামত তুলে ধরেন।

বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ভিন্নমত বোঝা, যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ, সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং পারস্পরিক সহনশীলতা গড়ে তোলার সময়। নবীন শিক্ষার্থীদের সামনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফজলুর রহমানের বক্তব্যে এসব বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নও আলোচনায় আসে। তার বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হতে পারে, বিশেষ করে ধর্ম, শিক্ষা ও রাজনীতির সম্পর্ক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে।

সব মিলিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনবরণ অনুষ্ঠানটি শুধু নতুন শিক্ষার্থীদের বরণ করে নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেখানে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, রাজনীতি, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের দৃষ্টিভঙ্গিও উঠে এসেছে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সিনিয়র মাদরাসা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা তার মন্তব্যটি অনুষ্ঠানের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত