৪৯৪ বস্তা ভুট্টাসহ ট্রাক উধাও, থানায় অভিযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৬ বার
৪৯৪ বস্তা ভুট্টাসহ ট্রাক উধাও, থানায় অভিযোগ

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে ৪৯৪ বস্তা ভুট্টা নিয়ে ভোলার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পর আট দিন ধরে ট্রাকসহ চালকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নির্ধারিত গন্তব্যে ভুট্টা পৌঁছানোর কথা থাকলেও সময় পেরিয়ে গেলেও চালানটির কোনো হদিস মেলেনি। চালকের মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে। এ ঘটনায় ভুট্টার মালিকপক্ষ দর্শনা থানায় ট্রাকের মালিক ও চালকের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেছে।

নিখোঁজ হওয়া ভুট্টার পরিমাণ ৪৯৪ বস্তা, যার মোট ওজন প্রায় ২১ হাজার ৬৯০ কেজি। মালিকপক্ষের হিসাবে এসব ভুট্টার আনুমানিক বাজারমূল্য ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ পণ্য নিয়ে একটি ট্রাক নির্ধারিত গন্তব্যে না পৌঁছানোর ঘটনায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দর্শনা পৌরসভার করিমপুর এলাকায় একটি নিজস্ব গোডাউন থেকে ৪৯৪ বস্তা ভুট্টা ট্রাকে তোলা হয়। ভুট্টাগুলো কাজী ফার্মস লিমিটেডের ভোলার খেয়াঘাট ২৫ ইউনিটে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাঠানো হচ্ছিল।

পণ্য পরিবহনের জন্য যশোর-ট-১১-৩৫৩৪ নম্বরের একটি ট্রাক ভাড়া করা হয়েছিল। ট্রাকটি দর্শনা শহরের পুরাতন বাজারসংলগ্ন রেল ইয়ার্ড এলাকার সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী ও আমদানি-রপ্তানিকারক রফিকুল ইসলামের মাধ্যমে ৩২ হাজার টাকা ভাড়ায় চুক্তিবদ্ধ করা হয় বলে অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে। ট্রাকটির চালক ছিলেন মহিবুল ইসলাম।

ভুট্টার মালিকপক্ষের ভাষ্য, নিয়ম অনুযায়ী ১০ সেপ্টেম্বর দর্শনা থেকে ভুট্টাবাহী ট্রাকটি ভোলার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। স্বাভাবিক পরিবহন ব্যবস্থায় দুই দিনের মধ্যেই পণ্য গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার কথা। সে অনুযায়ী ১২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজী ফার্মস লিমিটেডের ভোলার খেয়াঘাট ইউনিটে ভুট্টা পৌঁছানোর কথা ছিল।

কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও ভুট্টা গন্তব্যে না পৌঁছালে মালিকপক্ষ খোঁজ নিতে শুরু করে। প্রথমে পরিবহনজনিত কোনো বিলম্ব হয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা করা হয়। পরে চালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ে।

কাজী ফার্মস লিমিটেডের প্রতিনিধি ও ভুট্টা ব্যবসায়ী ইকবাল কবির জাহিদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিয়মিত ভুট্টা পরিবহন করে থাকেন। সাধারণত দর্শনা থেকে ভোলায় পণ্য পৌঁছাতে সর্বোচ্চ দুই দিন সময় লাগে। কিন্তু এবার আট দিন পার হয়ে গেলেও পণ্য কিংবা ট্রাকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ১০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দর্শনা থেকে ৪৯৪ বস্তা ভুট্টা ভোলার খেয়াঘাটে পাঠানো হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেই ভুট্টা গন্তব্যে পৌঁছেনি। তিনি জানান, চালকের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

পণ্যটির অবস্থান জানতে মালিকপক্ষ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ চালিয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো সূত্র থেকে ট্রাক বা ভুট্টার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় বিষয়টি নিয়ে থানায় অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নেয় মালিকপক্ষ।

অভিযোগকারী ইকবাল কবির জাহিদ জানান, ট্রাকটির মালিক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে চালক মহিবুল ইসলামের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় ট্রাক মালিকের আচরণ তাঁদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এটি অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য; এর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

পরে বৃহস্পতিবার রাতে দর্শনা থানায় ট্রাক মালিক ও চালকের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে ভুট্টা নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে পণ্য উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

দর্শনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, একটি ট্রাকে করে ৪৯৪ বস্তা ভুট্টা নিয়ে যাওয়ার পর সেটি উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়ে থানায় অভিযোগ এসেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের তদন্তে এখন মূলত ট্রাকটির সর্বশেষ অবস্থান, চালকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ, পরিবহনপথে কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না এবং পণ্যটি কোথায় গেছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে ট্রাকের মালিক ও চালকের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ব্যবসায়ীদের জন্য পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে একসঙ্গে কয়েক লাখ টাকার পণ্য দূরবর্তী জেলায় পাঠানোর ক্ষেত্রে পরিবহনকারী, চালক এবং মালিকপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার পাশাপাশি সঠিক নথিপত্র ও যোগাযোগব্যবস্থা থাকা জরুরি। কোনো চালান নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে না পৌঁছালে ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি পণ্যের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়।

দর্শনার এই ঘটনায়ও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ৪৯৪ বস্তা ভুট্টার ওজন প্রায় ২১ হাজার ৬৯০ কেজি। অর্থাৎ এটি ছোট কোনো চালান নয়। এত বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানোর পর তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় মালিকপক্ষ দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েছে।

ভুট্টা বর্তমানে পোলট্রি ও পশুখাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাজী ফার্মসের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছানো সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে একটি বড় চালান মাঝপথে আটকে গেলে বা নিখোঁজ হলে তার প্রভাব শুধু একজন ব্যবসায়ীর আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে এই ঘটনায় ভুট্টা কীভাবে নিখোঁজ হয়েছে, ট্রাকটি কোথায় গেছে কিংবা এর পেছনে কারও অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মালিকপক্ষ সন্দেহের কথা জানালেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। পুলিশও জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনার আট দিন পার হলেও ট্রাকচালকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি বলে মালিকপক্ষ জানিয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাক ও ভুট্টার অবস্থানও অজানা। ফলে তদন্তের মাধ্যমে চালক মহিবুল ইসলামের সর্বশেষ অবস্থান এবং ট্রাকটির চলাচলের তথ্য বের করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় পর্যায়ে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষকে দায়ী করা বা ঘটনার চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। পুলিশি তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পর্যালোচনার পরই প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

দর্শনা থানার পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যদি পণ্য আত্মসাৎ, চুরি, প্রতারণা বা অন্য কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে নিখোঁজ ভুট্টা ও ট্রাক উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে।

এখন ব্যবসায়ী ইকবাল কবির জাহিদসহ সংশ্লিষ্টদের অপেক্ষা, তদন্তের মাধ্যমে ৪৯৪ বস্তা ভুট্টা ও ট্রাকটির অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়া যায় কি না। পণ্যটির গন্তব্যে না পৌঁছানোর কারণ এবং আট দিন ধরে চালকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার রহস্যও তদন্তের পরই পরিষ্কার হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত