প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গুম প্রতিরোধ, সাইবার নিরাপত্তা ও অন্যান্য আইনি কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাগরিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর বক্তব্য, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিক ও গণমাধ্যমের সমালোচনার সুযোগ যেন সংকুচিত না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই আলোচনায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলে এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘এসআরবি, গুম ও সাইবার আইন: মানবাধিকার লঙ্ঘন’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব বক্তব্য আসে। সভাটি আয়োজন করে এনসিপি। সেখানে মানবাধিকার, আইন প্রণয়ন, নিরাপত্তা কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে বক্তারা তাঁদের বিভিন্ন মতামত তুলে ধরেন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, নাগরিকদের অনলাইন ও অফলাইন—দুই ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে। তবে তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নাগরিকদের আরও সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা নাগরিক ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলেও সমালোচনার ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা নাগরিক ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সমালোচনার সুযোগ গণতান্ত্রিক পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে তিনি সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করেন। ফলে তাঁর বক্তব্যে একদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যদিকে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা—দুই বিষয়ই উঠে আসে।
আলোচনা সভায় এসআরবি প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায়। সাম্প্রতিক সময়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ নিয়ে জাতীয় সংসদে আইনগত প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নতুন ইউনিটটির দায়িত্বের মধ্যে জননিরাপত্তা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, বেআইনি অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং গুমের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামো, গুমসংক্রান্ত আইন এবং সাইবার আইনকে একই আলোচনার আওতায় এনে মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলেছে এনসিপি। সভার শিরোনামেও এসব বিষয়কে একসঙ্গে রাখা হয়। তবে নতুন আইনি কাঠামোর উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক মহলের মধ্যে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার মূল্যায়ন দল ও ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, আইনি কাঠামোর মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তিনি করেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের অভিযোগও তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন এবং আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো কীভাবে নাগরিক অধিকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আলোচনায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছে। তাঁর মতে, এই অবস্থায় কমিশনের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সম্ভব নয়। এটি তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও মূল্যায়ন; নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, নির্বাচন পরিচালনার প্রক্রিয়া এবং প্রমাণভিত্তিক তথ্য আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বর্তমান সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ভূমিকা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ একটি রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এর পাশাপাশি কমিশনের নিজস্ব বক্তব্য, সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং বাস্তবে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোও আলোচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
গুম ও মানবাধিকার প্রসঙ্গও সভায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। নতুন নিরাপত্তা কাঠামোতে গুমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ ধরনের অপরাধ তদন্ত ও প্রতিরোধের দায়িত্ব কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিও জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এসআরবির প্রস্তাবিত দায়িত্বের মধ্যে গুমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের তদন্তের ক্ষমতার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি ক্রমেই রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতারণা, সাইবার অপরাধ, তথ্য চুরি ও অনলাইন নিরাপত্তার বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে এমন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মতপ্রকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে মূলত এই ভারসাম্যের বিষয়টিই উঠে এসেছে।
আলোচনা সভায় এনসিপির আইন সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মুসা, রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার, আব্দুল্লাহ আল আমিন, যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক, জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর এবং গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদও আলোচনায় বক্তব্য দেন।
এদিকে গুম, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আরও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে র্যাবের পরিবর্তে এসআরবি গঠনের উদ্যোগের পর নতুন ইউনিটটির দায়িত্ব, কাঠামো এবং জবাবদিহির ধরন নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতামত প্রকাশ পেয়েছে। কেউ কেউ নতুন কাঠামোর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের বিষয়টি দেখছেন, আবার মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশ পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন কাঠামোর পার্থক্য এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এসব মতামত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত তিনটি বিষয় সামনে এসেছে—নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা আইন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি। তাঁর অভিযোগের পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর নির্দিষ্ট বিধান, আইন প্রয়োগের ঘটনা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার বিদ্যমান ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে নির্বাচন কমিশন নিয়ে তাঁর অভিযোগের ক্ষেত্রেও কমিশনের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে নাগরিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে মৌলিক অধিকার কীভাবে সমন্বয় করা হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ দমন, গুম প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি মতপ্রকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনগত সুরক্ষার বিষয়গুলোও একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ। ফলে নতুন আইন ও নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেগুলোর প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলামোটরের ওই আলোচনা সভায় বক্তাদের বক্তব্যে এসব প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। তবে বিভিন্ন অভিযোগ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আইন, সরকারি সিদ্ধান্ত, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম এবং ভবিষ্যতে এসব ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের ওপর।