তহবিল সংকটে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী, বাড়ছে শঙ্কা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৯ বার
তহবিল সংকটে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী, বাড়ছে শঙ্কা

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও লেবানন—একাধিক ফ্রন্টে দীর্ঘদিনের সামরিক তৎপরতার মধ্যে বড় ধরনের অর্থসংকটে পড়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত প্রায় ২৫ বিলিয়ন শেকেল বা ৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার অর্থ চাওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় অর্থ দ্রুত না পেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কার্যক্রম, সরঞ্জাম সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে প্রস্তুতি ব্যাহত হতে পারে। বিষয়টি ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও সরকারি বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইসরায়েলি আর্মি রেডিওর বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী সরকারের কাছে যে অতিরিক্ত অর্থ চেয়েছে, তা না পেলে গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অর্থসংকটের কারণে সেনা নিয়োগ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনা, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ভারী সাঁজোয়া যান মেরামতের মতো কার্যক্রমে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সেনাবাহিনীর উদ্বেগের মধ্যে লেবানন ফ্রন্টে শীতকালীন প্রস্তুতির বিষয়টিও রয়েছে। একই সঙ্গে বিমানবাহিনী, সামরিক গোয়েন্দা এবং প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস সংশ্লিষ্ট ইউনিটে নতুন সদস্য নিয়োগ নিয়েও সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলে সামরিক সূত্রের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ট্যাংক ও কামানের গোলাবারুদ এবং আকাশ থেকে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র কেনাকাটাও অর্থসংকটে আটকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বাজেট নিয়ে বিরোধ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামরিক ব্যয় দ্রুত বাড়লেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রতিরক্ষা খাতের অতিরিক্ত বরাদ্দ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান, রিজার্ভ সেনাদের দায়িত্বে রাখা এবং অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ব্যাপক ব্যবহার সরকারি অর্থের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির এর আগেও বাজেট সংকট নিয়ে প্রকাশ্যে সতর্ক করেছেন। আগস্টে তিনি বলেছিলেন, বিভিন্ন ফ্রন্টে সেনা ও সামরিক সদস্যরা কাজ করার পাশাপাশি বাহিনীকে অর্থের ঘাটতির সমস্যাও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত অর্থের অভাব সামরিক প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে চলমান চাপের পেছনে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধারাবাহিক সামরিক ব্যয় বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের মূল প্রতিরক্ষা বাজেটের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪৩ বিলিয়ন শেকেল। পরে সামরিক পরিস্থিতির কারণে এতে বড় ধরনের অতিরিক্ত বরাদ্দ যুক্ত করা হয়। মার্চে ইসরায়েলের পার্লামেন্টের অর্থবিষয়ক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট ১৪২ বিলিয়ন শেকেলের বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং আগের অনুমোদিত কাঠামোর তুলনায় এতে ৩০ বিলিয়নের বেশি শেকেল যুক্ত হয়েছিল।

পরবর্তীতে আরও অর্থ সংযোজনের পরিকল্পনাও সামনে আসে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ২০২৬ সালের মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় ১৮৪ বিলিয়ন শেকেলে পৌঁছানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর কতটা চাপ তৈরি করছে, তা এ ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি থেকেই বোঝা যায়।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও চলতি বছর যুদ্ধজনিত ব্যয়ের কারণে সরকারি বাজেটে বড় ধরনের সমন্বয়ের কথা জানিয়েছে। মার্চে ব্যাংক অব ইসরায়েল জানায়, সরকার প্রতিরক্ষা বাজেট ৩২ বিলিয়ন শেকেল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নিরাপত্তা ও বেসামরিক ব্যয়ের জন্য আরও প্রায় ১৩ বিলিয়ন শেকেলের রিজার্ভ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সময়ে সংশোধিত বাজেট কাঠামোতে ঘাটতি ও ঋণ-জিডিপি অনুপাত নিয়ে উদ্বেগের কথাও উল্লেখ করা হয়।

এ কারণে প্রতিরক্ষা খাতে আরও অর্থ দেওয়ার বিষয়টি শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ইসরায়েলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ব্যয় বাড়তে থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং অন্যান্য বেসামরিক খাতের জন্য অর্থ বরাদ্দের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। ইসরায়েলের ২০২৬ সালের বাজেট নিয়ে ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণেও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর এর প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। তবে তিনি নতুন করে রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর চাপ না বাড়িয়ে ক্ষমতাসীন জোটের জন্য বরাদ্দ তহবিল থেকে অর্থের সংস্থান করার প্রস্তাব দিয়েছেন। সামরিক ব্যয় নিয়ে সরকারের ভেতরে ও বাইরে এই বিতর্ক দেখাচ্ছে, নিরাপত্তা প্রয়োজন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ শুধু গাজা বা লেবাননকেন্দ্রিক নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য এলাকায় সামরিক তৎপরতার কারণে বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সিরিয়া ও ইয়েমেনসহ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সক্ষমতা বজায় রাখতে হচ্ছে। ফলে সামরিক সরঞ্জাম, জনবল, গোলাবারুদ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের চাহিদা একসঙ্গে বেড়েছে।

লেবানন ফ্রন্টও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেখানে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা এবং সীমান্ত উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় শীতকালীন প্রস্তুতি, সেনা মোতায়েন এবং সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলছে। ফলে সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা—দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।

অন্যদিকে গাজা ও পশ্চিম তীরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলি বাহিনীর জনবল ও সরঞ্জামের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে। একাধিক এলাকায় একই সময়ে সেনা মোতায়েন রাখতে হলে নিয়মিত সেনাদের পাশাপাশি রিজার্ভ সদস্যদের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এর ফলে সামরিক ব্যয়ের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, বেতন, সরঞ্জাম, চিকিৎসা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।

অর্থসংকটের প্রভাব অস্ত্র উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা শিল্পেও পড়তে পারে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্পের কিছু প্রতিষ্ঠান আগেই জানিয়েছিল, নতুন অর্ডারের অর্থায়ন ও সরকারি অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে সামরিক বাহিনীর বর্তমান মজুত এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সামরিক বাহিনীর দাবি এবং সরকারের বাজেট বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সামরিক নেতৃত্ব যেখানে দ্রুত অর্থ ছাড়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, সেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়কে একই সঙ্গে ঘাটতি, ঋণ এবং বেসামরিক ব্যয়ের চাপ সামলাতে হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বরাদ্দ অনুমোদন করা হলেও সেই অর্থ কখন এবং কীভাবে সেনাবাহিনীর হাতে পৌঁছাবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একাধিক সামরিক ফ্রন্টে প্রস্তুতি বজায় রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণ করা। সেনাবাহিনী যদি প্রয়োজনীয় অর্থ সময়মতো না পায়, তাহলে অস্ত্র কেনা, সরঞ্জাম মেরামত, সেনা নিয়োগ এবং কিছু সামরিক প্রস্তুতি কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে বলে সামরিক সূত্রগুলো সতর্ক করেছে।

সব মিলিয়ে ইসরায়েলের সামরিক বাজেট ঘিরে বর্তমান সংকট শুধু অর্থের ঘাটতির বিষয় নয়; এটি দেশটির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা, প্রতিরক্ষা ব্যয়, রাষ্ট্রীয় ঋণ এবং বেসামরিক অর্থনীতির ওপর সামরিক সংঘাতের প্রভাবের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। একাধিক ফ্রন্টে সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে এই আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে আগামী সময়ে ইসরায়েল সরকার কীভাবে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটায় এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করে, সেটিই পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত