প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অর্থ পাচার, হুন্ডি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের মতো আর্থিক অপরাধ মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা আরও বাড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। অপরাধীদের লেনদেনের কৌশল যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি তারা প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডার্ক ওয়েব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো নতুন প্রযুক্তিনির্ভর মাধ্যম ব্যবহার করছে। এসব পরিবর্তিত ঝুঁকি মোকাবিলায় বিএফআইইউর তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে দুটি আধুনিক সফটওয়্যার—ফাইভকাস্ট ওনিক্স এবং চেইনঅ্যালাইসিস রিঅ্যাক্টর—সংযোজনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সফটওয়্যার দুটি সংগ্রহ ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করে সফটওয়্যার দুটির দরপ্রস্তাব মূল্যায়ন, কারিগরি সক্ষমতা যাচাই এবং দরদাতার সঙ্গে আলোচনা সম্পন্ন করার জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা ব্যবস্থায় বিএফআইইউ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংস্থাটি বিভিন্ন রিপোর্টিং প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন, নগদ লেনদেনের তথ্য এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব তথ্য ও আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়। পাশাপাশি অর্থপাচার ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে রিপোর্টিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বও বিএফআইইউর রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সময়ে আর্থিক অপরাধ শনাক্ত করা আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। আগে ব্যাংক হিসাব, নগদ লেনদেন কিংবা প্রচলিত আর্থিক চ্যানেল বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধের আর্থিক প্রবাহ শনাক্ত করার চেষ্টা করা হতো। এখন অপরাধী চক্র একাধিক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, হিসাব, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং ভার্চুয়াল সম্পদের মধ্যে লেনদেন ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে একটি লেনদেনের পেছনে থাকা প্রকৃত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে বিপুল পরিমাণ তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন হয়।
এই জায়গাতেই ফাইভকাস্ট ওনিক্সের মতো ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বা OSINT-ভিত্তিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সফটওয়্যারটি উন্মুক্ত ডিজিটাল উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ, অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণে সহায়তা করার জন্য তৈরি। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, এটি সারফেস ওয়েব, ডিপ ওয়েব ও ডার্ক ওয়েবসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত ডিজিটাল উৎস থেকে তথ্য বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হতে পারে এবং ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, অবস্থান ও কার্যক্রমের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে।
মানিলন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য ব্যবহার আরও বিস্তৃত। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি অনলাইনে একাধিক পরিচয় বা যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকে কিংবা একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, তাহলে বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য সংযোগ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এতে তদন্তকারীদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে একটি সমন্বিত চিত্র তৈরি করা সহজ হতে পারে।
তবে উন্মুক্ত উৎসের তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে থাকা কোনো তথ্য নিজে থেকেই অপরাধের প্রমাণ নয়। ফলে এ ধরনের প্রযুক্তি তদন্তকারীদের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সহায়তা করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানবীয় যাচাই, প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা এবং আইনগত প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
অন্যদিকে, চেইনঅ্যালাইসিস রিঅ্যাক্টর মূলত ব্লকচেইন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহৃত একটি প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ঠিকানা ও লেনদেনের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ এবং অর্থের গতিপথ অনুসরণে তদন্তকারীরা সহায়তা পেতে পারেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্তেও ব্লকচেইন বিশ্লেষণ ব্যবহার করে ক্রিপ্টোকারেন্সির অর্থপ্রবাহ অনুসরণ করার নজির রয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার বিশ্বজুড়ে বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ অর্থের গতিপথ শনাক্ত করাও আইন প্রয়োগকারী ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ভার্চুয়াল সম্পদের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করা হলে তদন্তের ধরনও বদলে যায়। ব্লকচেইনভিত্তিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে অর্থের গতিপথ, সংশ্লিষ্ট ঠিকানাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য আর্থিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
চেইনঅ্যালাইসিসের সাম্প্রতিক প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ব্লকচেইন বিশ্লেষণ ব্যবহার করে তদন্তকারীরা নির্দিষ্ট ক্রিপ্টো ঠিকানা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ালেট, এক্সচেঞ্জ ও অন্যান্য অবকাঠামোর মধ্যে অর্থের প্রবাহ অনুসরণ করতে পারেন। এসব তথ্য দীর্ঘমেয়াদি তদন্তে একটি বড় আর্থিক নেটওয়ার্কের চিত্র তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি যুক্ত হলে বিএফআইইউর প্রচলিত আর্থিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণের সঙ্গে ডিজিটাল ও ব্লকচেইনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণের সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যের পাশাপাশি অনলাইন যোগাযোগ, ডিজিটাল পরিচয় এবং ভার্চুয়াল সম্পদের লেনদেনের মধ্যে সম্পর্ক খোঁজার সুযোগ বাড়তে পারে।
সফটওয়্যার দুটি কেনার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া দরপ্রস্তাব মূল্যায়ন, কারিগরি গ্রহণযোগ্যতা যাচাই এবং আলোচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর-৪-এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে বহিরাগত সদস্য হিসেবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে একজন কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এর আগে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধে বিএফআইইউ বিভিন্ন খাতে নজরদারি জোরদার করেছে। চলতি সেপ্টেম্বরেও পুঁজিবাজারের বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠনের নির্দেশনা জারি করেছে সংস্থাটি। এতে কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট এবং শাখা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
অর্থাৎ নতুন সফটওয়্যার সংযোজনকে বিএফআইইউর সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর্থিক খাতে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও নেটওয়ার্কের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করাই এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ মনে করেন, অর্থ পাচার, হুন্ডি ও সন্ত্রাসী অর্থায়নের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তার মতে, অপরাধের কৌশল যখন বদলাচ্ছে, তখন তদন্ত ও গোয়েন্দা বিশ্লেষণের প্রযুক্তিও আধুনিক হওয়া প্রয়োজন। বিএফআইইউর নতুন সফটওয়্যার সংযোজনের উদ্যোগকে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন।
বাংলাদেশে অর্থপাচার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়েছে। দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন—সব ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি হচ্ছে। এই বিপুল তথ্যের মধ্যে প্রকৃত ঝুঁকি শনাক্ত করতে শুধু প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করলে তদন্তকারীদের সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ সেখানে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, তার কার্যকারিতা নির্ভর করবে দক্ষ জনবল, তথ্যের মান, আন্তঃসংস্থার সহযোগিতা এবং আইনগত কাঠামোর সঠিক প্রয়োগের ওপর। একটি সফটওয়্যার বিপুল তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারলেও সেই তথ্য থেকে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সিদ্ধান্ত তৈরি করতে প্রশিক্ষিত বিশ্লেষক ও তদন্তকারীর প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, আইনগত অনুমোদন এবং তথ্য ব্যবহারের সীমারেখাও যথাযথভাবে অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ফাইভকাস্ট ওনিক্স এবং চেইনঅ্যালাইসিস রিঅ্যাক্টরের মতো প্রযুক্তি বিএফআইইউর ব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগ দেশের অর্থপাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থায় একটি প্রযুক্তিগত সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে অনলাইন ও উন্মুক্ত উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ, অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ব্লকচেইনভিত্তিক লেনদেন অনুসরণের সক্ষমতা—দুই দিক একসঙ্গে জোরদার হলে পরিবর্তিত আর্থিক অপরাধের ধরন শনাক্ত ও বিশ্লেষণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এসব প্রযুক্তির সফল ব্যবহার নির্ভর করবে যথাযথ ক্রয়প্রক্রিয়া, দক্ষ ব্যবহার, তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালার সঠিক প্রয়োগের ওপর।