৭৩ গোলেই ব্যালন ডি’অরের দাবির জবাব কেইনের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
৭৩ গোলেই ব্যালন ডি’অরের দাবির জবাব কেইনের

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে একজন ফুটবলারের ধার কমে যাওয়াটাই যেন স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু হ্যারি কেইনের ক্ষেত্রে গল্পটা যেন উল্টো পথে হাঁটছে। ৩০ বছর বয়সে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার পর ইংলিশ স্ট্রাইকারের গোলসংখ্যা কমেনি, বরং প্রতিটি মৌসুমে তাঁর গোল করার ধার আরও তীব্র হয়েছে। সর্বশেষ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৭৩ গোলের অসাধারণ পরিসংখ্যান দাঁড় করিয়ে এবার ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় নিজের অবস্থান আরও জোরালো করেছেন তিনি।

কেইনের গত মৌসুমের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যায় কেন তাঁকে বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কারের অন্যতম আলোচিত প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ২০২৫–২৬ মৌসুমে তিনি করেছেন ৬১ গোল। এর সঙ্গে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে আরও ১২ গোল যোগ হলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৩। ৬৫ ম্যাচে এই গোলসংখ্যা একজন স্ট্রাইকারের ধারাবাহিকতা ও গোল করার সক্ষমতার বড় প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে।

তবে ব্যালন ডি’অর জেতার বিষয়টি শুধু গোলসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলীয় সাফল্য, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবদান এবং ভোটারদের মূল্যায়নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কেইন নিজেও বিষয়টি জানেন। তাই নিজের সম্ভাবনা নিয়ে অতিরিক্ত কথা না বলে তিনি বরং মাঠের পরিসংখ্যানকেই সামনে রাখছেন।

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেইন তাঁর গত মৌসুমকে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুমগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ব্যালন ডি’অরের ফল তাঁর হাতে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, বিষয়টি পুরোপুরি ভোটদাতাদের ওপর নির্ভরশীল। তবে তাঁর ৭৩ গোলই গত মৌসুমে তাঁর পারফরম্যান্সের একটি বড় ছবি তুলে ধরে—এমন বক্তব্য দিয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।

বায়ার্নের হয়ে কেইনের গত মৌসুম ছিল বিশেষভাবে সফল। জার্মান ক্লাবটির হয়ে তিনি বুন্দেসলিগা ও জার্মান কাপ জয়ে ভূমিকা রাখেন। ব্যক্তিগত গোলের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যও তাঁর ব্যালন ডি’অর দাবিকে আলোচনায় রেখেছে। এর সঙ্গে ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পারফরম্যান্সও যোগ হয়েছে।

জুলাইয়ে শেষ হওয়া বিশ্বকাপেও কেইন ছিলেন ইংল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। ছয় গোল করে তিনি দলকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে ক্লাব ফুটবলে গোলের ধারাবাহিকতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তাঁর পারফরম্যান্স ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। ইংলিশ ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে এ কারণেই তাঁকে ঘিরে ব্যালন ডি’অরের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

তবে কেইনের সামনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালও নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে পুরস্কারের আলোচনায় রয়েছেন। এমবাপ্পে গত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৪২ গোল করেছেন। বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে ওঠার পথে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গোল্ডেন বুটও জিতেছেন। বিশ্বকাপের গোলসংক্রান্ত রেকর্ডেও নিজের নাম যুক্ত করেছেন তিনি।

অন্যদিকে বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালও গত মৌসুমে উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। ক্লাবের হয়ে তিনি ২৪ গোল করার পাশাপাশি ১৮টি গোলে সহায়তা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় ও ক্লাব পর্যায়ে দলীয় সাফল্যের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়েছে। ফলে ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় কেইন, এমবাপ্পে ও ইয়ামালকে ঘিরে বিতর্ক ও তুলনা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।

তবে কেইনের বক্তব্যে আত্মপ্রচারের চেয়ে পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভরতার বিষয়টি স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, মাঠে তাঁর পারফরম্যান্সের হিসাবই তাঁর হয়ে কথা বলবে। ৭৩ গোলের পরিসংখ্যানকে সামনে রেখে তিনি ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছেন।

ব্যালন ডি’অর এবার কেইনের জন্য আরও একটি কারণে বিশেষ। প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে এই পুরস্কারের আয়োজন হতে যাচ্ছে। কেইনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা লন্ডনে। ফলে নিজের শহরে ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারের অনুষ্ঠান হওয়া তাঁর জন্য আলাদা আবেগের বিষয়।

এ প্রসঙ্গে কেইন জানিয়েছেন, অনেকেই তাঁকে বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়েছেন। নিজের শহরে অনুষ্ঠান হওয়ায় তাঁর কাছে এবারের আয়োজন বিশেষ অনুভূতি তৈরি করছে। তবে শেষ পর্যন্ত কী হবে, সেটি সময়ই বলে দেবে—এমন অবস্থান নিয়েছেন তিনি।

কেইনের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে বয়সের সঙ্গে তাঁর পারফরম্যান্সের পরিবর্তনও বেশ লক্ষণীয়। টটেনহ্যাম হটস্পারে থাকার সময় এক মৌসুমে তাঁর সর্বোচ্চ গোল ছিল ৪১টি, যা তিনি ২০১৭–১৮ মৌসুমে করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। এরপর ২০২৩ সালে ৩০ বছর বয়সে বায়ার্নে যোগ দেন তিনি।

বায়ার্নে যোগ দেওয়ার পর প্রথম তিন মৌসুমে তাঁর ক্লাব গোলের হিসাব ছিল যথাক্রমে ৪৪, ৪১ ও ৬১। শেষ সংখ্যাটি তাঁর সর্বশেষ মৌসুমের। বয়স ৩০ পেরিয়ে যাওয়ার পরও এমন গোলের ধারাবাহিকতা তাঁকে ইউরোপের অন্যতম আলোচিত স্ট্রাইকার হিসেবে ধরে রেখেছে।

কেইনের সর্বশেষ গোলসংখ্যা ইতিহাসের একটি বিশেষ পরিসংখ্যানের সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে। ২০১১–১২ মৌসুমে লিওনেল মেসি ৬৯ ম্যাচে ৮২ গোল করেছিলেন। এরপর কেইনের ৭৩ গোল গত মৌসুমের অন্যতম সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত গোলসংখ্যা হিসেবে সামনে এসেছে।

তবে শুধু গোলের সংখ্যা দিয়ে একজন ফুটবলারের সম্পূর্ণ অবদান পরিমাপ করা যায় না। কেইন নিজেও শুধু গোলস্কোরার হিসেবে পরিচিত নন। তিনি আক্রমণ তৈরিতে অংশ নেন, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেন এবং মাঝমাঠের কাছাকাছি নেমে এসে খেলায় যুক্ত হওয়ার ক্ষমতাও দেখিয়েছেন। একজন আধুনিক স্ট্রাইকার হিসেবে তাঁর ভূমিকা তাই শুধু গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এত বয়সে এত বেশি ম্যাচ খেলার পেছনে নিজের ব্যক্তিগত প্রস্তুতিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন কেইন। তাঁর বর্তমান ফর্ম ও শারীরিক সক্ষমতার পেছনে ব্যক্তিগত ক্রীড়া চিকিৎসক আলেহান্দ্রো এলোরিয়াগার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তিনি। কেইনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন এলোরিয়াগা। প্রায় সাড়ে ছয় বছর ধরে তাঁদের একসঙ্গে কাজ করার কথা জানিয়েছেন কেইন।

কেইনের মতে, পর্দার আড়ালে দীর্ঘ সময় ধরে করা এই কাজ তাঁর বর্তমান পারফরম্যান্সের অন্যতম ভিত্তি। বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেক ফুটবলারের পারফরম্যান্সে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন আসে। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে তিনি তার বিপরীত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। নিয়মিত প্রস্তুতি, শারীরিক যত্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে নিজের ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।

গোল করার আনন্দও তাঁর কাছে এখনো আগের মতোই তীব্র। সাক্ষাৎকারে কেইন জানিয়েছেন, গোল উদ্‌যাপন করতে কখনোই তাঁর ক্লান্ত লাগে না। গোল করার মুহূর্তকে তিনি ফুটবলের সবচেয়ে দারুণ অনুভূতিগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে এই অনুভূতিতে উত্তেজনার পাশাপাশি মানসিক স্বস্তিও আসে বলে জানিয়েছেন তিনি। খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর এই অনুভূতিই তিনি সবচেয়ে বেশি মিস করবেন বলেও উল্লেখ করেছেন।

কেইনের সামনে এখন তাই অপেক্ষা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাতের। ২৬ অক্টোবর ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের মধ্য থেকে ভোটের মাধ্যমে পুরস্কারজয়ী নির্ধারিত হবে। কেইনের ৭৩ গোল, বায়ার্নের হয়ে জার্মানির ঘরোয়া শিরোপা এবং ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে ছয় গোল—সবকিছুই তাঁর পক্ষে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অন্যদিকে এমবাপ্পে ও ইয়ামালের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স এবং দলীয় সাফল্যও ভোটারদের মূল্যায়নে জায়গা পাবে।

শেষ পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর কার হাতে উঠবে, তা নির্ধারণ করবে ভোট। কেইন অবশ্য নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বড় কোনো দাবি তুলছেন না। তাঁর হয়ে কথা বলছে মাঠের পরিসংখ্যান। ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোলের সেই সংখ্যাই এখন তাঁর ব্যালন ডি’অর-স্বপ্নের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত