সৌদির এফ-৩৫ কেন এত বিতর্কিত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
সৌদির এফ-৩৫ কেন এত বিতর্কিত

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সৌদি আরবের কাছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের অনুমোদন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রিয়াদ এই যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও ইসরায়েলের সামরিক সুবিধা, অত্যাধুনিক মার্কিন প্রযুক্তির নিরাপত্তা এবং সৌদি-চীন সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনে বিতর্ক ছিল। এখন সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিক্রির প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—কেন এফ-৩৫ নিয়ে এত সতর্কতা এবং কেন সৌদি আরবকে এই যুদ্ধবিমান দেওয়ার সিদ্ধান্ত এত গুরুত্বপূর্ণ?

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমান ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম বিক্রির সম্ভাব্য প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। পুরো প্যাকেজটির আনুমানিক মূল্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। তবে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়ার পরও এটি সম্পূর্ণ চূড়ান্ত চুক্তি নয়; মার্কিন কংগ্রেসকে প্রস্তাবটি পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, রিয়াদের হাতে বিমান পৌঁছানোর আগে আরও কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে।

এফ-৩৫কে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো স্টেলথ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে বিমানটি শত্রুপক্ষের রাডারে তুলনামূলকভাবে কম শনাক্তযোগ্য অবস্থায় অভিযান পরিচালনা করতে পারে। একই সঙ্গে এতে উন্নত সেন্সর, যোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্য সংগ্রহ ও যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে এটি কেবল একটি যুদ্ধবিমান নয়; আধুনিক সামরিক অভিযানে তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও দেখা হয়।

এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এফ-৩৫ বিক্রির ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলই এফ-৩৫ পরিচালনাকারী একমাত্র দেশ। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় ইসরায়েলের সামরিক প্রযুক্তিগত সুবিধা বা ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বজায় রাখা। সৌদি আরবকে একই শ্রেণির অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান দেওয়ার ফলে সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে

তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য হলো, প্রস্তাবিত বিক্রির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন হবে না। ওয়াশিংটনের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করা, ভবিষ্যৎ হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে আন্তঃকার্যক্ষমতা বাড়ানোই এই বিক্রির অন্যতম উদ্দেশ্য। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এটিকে শুধু অস্ত্র বিক্রি হিসেবে নয়, সৌদি-মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবেও দেখছে।

কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্যের উদ্বেগের জায়গাটি ভিন্ন। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক তাদের দুশ্চিন্তার একটি বড় কারণ। সমালোচকদের আশঙ্কা, অত্যাধুনিক এফ-৩৫ প্রযুক্তি সৌদি আরবের মাধ্যমে কোনোভাবে চীনের কাছে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রাজা কৃষ্ণমূর্তি এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি চীনের নাগালের মধ্যে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এটি অবশ্য সমালোচকদের উদ্বেগ ও রাজনৈতিক অবস্থান; সৌদি আরব এমন প্রযুক্তি হস্তান্তর করবে—এমন কোনো প্রমাণিত তথ্য এখানে নেই।

এফ-৩৫ বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নিরাপত্তার বিষয়টি যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তার উদাহরণ অতীতেও দেখা গেছে। তুরস্ক রুশ এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর ওয়াশিংটন এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে আঙ্কারাকে বাদ দিয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ছিল, রুশ প্রযুক্তির সঙ্গে এফ-৩৫-এর ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি হলে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানটির সক্ষমতা ও প্রযুক্তি সম্পর্কে মস্কো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি নিরাপত্তার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

সৌদি আরবের জন্যও এফ-৩৫ কেনার বিষয়টি কেবল সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের চেষ্টা করছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং ইয়েমেনের সংঘাত—সব মিলিয়ে সৌদি নেতৃত্বের কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা ও আকাশযুদ্ধ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে সংঘাত এবং সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও এই প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি-মার্কিন সম্পর্কের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস। সৌদি আরব বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় অস্ত্র ক্রেতাদের একটি। দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি জ্বালানি, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়েও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। ফলে এফ-৩৫ বিক্রির সিদ্ধান্তকে শুধু একটি নির্দিষ্ট অস্ত্র চুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা না করে দুই দেশের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ইসরায়েলের অবস্থানও এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইসরায়েল বহু বছর ধরে এফ-৩৫ ব্যবহার করছে এবং এই যুদ্ধবিমানকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। সৌদি আরব এফ-৩৫ পেলে মধ্যপ্রাচ্যে এই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী দেশের সংখ্যা বাড়বে। একই সময়ে ইসরায়েলও নিজেদের এফ-৩৫ বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। ফলে ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, সৌদি আরবকে বিমান সরবরাহ করলেও ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত ও সামরিক সুবিধা বজায় রাখার ব্যবস্থা থাকবে।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের জন্য এই চুক্তি দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি বড় আধুনিকায়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে বিমান কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়ও জড়িত। ফলে ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজটি শুধু যুদ্ধবিমান কেনার মূল্য নয়; এর সঙ্গে বিভিন্ন সহায়ক সরঞ্জাম ও পরিষেবাও যুক্ত রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনুমোদন পাওয়া মানেই আগামীকাল থেকেই সৌদি আকাশে এফ-৩৫ উড়বে—এমন নয়। কংগ্রেসের পর্যালোচনা, চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা, উৎপাদন, প্রশিক্ষণ এবং সরবরাহের মতো একাধিক ধাপ রয়েছে। ফলে বাস্তবে সৌদি আরবের হাতে বিমান পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

এফ-৩৫ নিয়ে বর্তমান বিতর্ক তাই মূলত তিনটি প্রশ্নকে সামনে আনছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক সুবিধা কীভাবে বজায় রাখা হবে। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে অত্যাধুনিক মার্কিন প্রযুক্তির নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। তৃতীয়ত, ইয়েমেন, ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যের সম্পর্ক কী হবে।

ওয়াশিংটন বলছে, এই বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যকে সহায়তা করবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় সৌদি আরবের ভূমিকা জোরদার করবে। অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসের কিছু সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা মহল প্রযুক্তি সুরক্ষা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়টি এখন শুধু একটি অস্ত্র চুক্তি নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি, ইসরায়েলের সামরিক সুবিধা, চীনের সঙ্গে সৌদির সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত