বিদ্যুৎ বিলে মিটার ভাড়া-ডিমান্ড চার্জের হিসাব

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
বিদ্যুৎ বিলে মিটার ভাড়া-ডিমান্ড চার্জের হিসাব

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর মাস শেষে বিল হাতে নিয়ে অনেক গ্রাহকেরই হিসাব মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল খরচের বাইরে মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিলম্ব মাশুল যুক্ত হওয়ায় মোট বিলের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে আবার রিচার্জের সময়ই বিভিন্ন চার্জ কেটে নেওয়া হচ্ছে। ফলে মিটারে টাকা ভরার পর প্রত্যাশার তুলনায় কম ব্যালান্স দেখলে অনেক গ্রাহকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণে একাধিক স্ল্যাব রয়েছে। একজন গ্রাহক মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, তার ওপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট হারে এনার্জি চার্জ হিসাব করা হয়। নতুন মূল্য কাঠামো অনুযায়ী ৪০০ ইউনিটের পরবর্তী ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১ পয়সা এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রতি ইউনিটের দাম ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। মূল বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচের সঙ্গে পাঁচ শতাংশ হারে ভ্যাটও যুক্ত হয়।

তবে মাসিক বিদ্যুৎ বিল শুধু ব্যবহৃত ইউনিটের মূল্য দিয়েই শেষ হয় না। গ্রাহকের অনুমোদিত লোডের ওপর নির্ভর করে ডিমান্ড চার্জ যুক্ত হয়। কোনো গ্রাহকের আগের মাসের বিল বকেয়া থাকলে সেটিও পরবর্তী বিলে যুক্ত হতে পারে এবং বিলম্বে পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিলম্ব মাশুলও দিতে হতে পারে। মিটার ভাড়ার বিষয়টি প্রযোজ্য হলে সেটিও মোট হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়।

ডিমান্ড চার্জ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন দেখা যায়। সহজভাবে বললে, কোনো সংযোগে গ্রাহক যে পরিমাণ বিদ্যুৎ লোডের জন্য অনুমোদন নিয়েছেন, সেই লোডের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হারে এই চার্জ হিসাব করা হয়। অর্থাৎ কোনো মাসে গ্রাহক তার অনুমোদিত সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার না করলেও সংযোগটি নির্দিষ্ট লোড সরবরাহের জন্য প্রস্তুত রাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চার্জ দিতে হয়।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কোনো বাসাবাড়ির অনুমোদিত লোড যদি দুই কিলোওয়াট হয়, তাহলে মাসে ডিমান্ড চার্জ হিসেবে ৮৪ টাকা দিতে হবে। আবার ১০ কিলোওয়াট লোডের সংযোগ হলে একই হারে মাসিক ডিমান্ড চার্জ দাঁড়াবে ৪২০ টাকা।

এখানেই গ্রাহকদের একটি অংশের আপত্তির জায়গা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংযোগ নেওয়ার সময় ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনা করে তুলনামূলক বেশি লোড অনুমোদন করিয়ে রাখে। পরবর্তী সময়ে বাস্তবে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও অনুমোদিত লোডের ভিত্তিতে ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়। ফলে কম ব্যবহার করেও নির্দিষ্ট একটি অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয় গ্রাহককে।

ডিমান্ড চার্জের পাশাপাশি মিটার ভাড়াও অনেক গ্রাহকের মোট ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে রিচার্জ করার সময়ই মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং ভ্যাটের মতো নির্ধারিত অর্থ কেটে নেওয়া হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে জমা থাকে। এ কারণে গ্রাহক অনেক সময় নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রিচার্জ করেও পুরো অর্থকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের টাকা হিসেবে পান না।

বিতরণ সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, সিঙ্গেল-ফেজ প্রিপেইড মিটারের মূল্য প্রায় ছয় হাজার টাকা ধরে ১০ বছরের আয়ুষ্কাল অনুযায়ী ১২০ মাসে মাসিক ৪০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়। অন্যদিকে থ্রি-ফেজ মিটারের ক্ষেত্রে মিটারের মূল্য প্রায় ২৫ হাজার টাকা ধরে মাসিক ভাড়া ২৫০ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মিটার নষ্ট হলে বিতরণ সংস্থার পক্ষ থেকে নতুন মিটার সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে।

প্রিপেইড মিটার চালুর পেছনে বিদ্যুৎ বিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো, বকেয়া কমানো এবং রাজস্ব আদায়কে আরও কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে। পোস্টপেইড ব্যবস্থায় মাস শেষে বিল তৈরি হওয়ার পর গ্রাহক অর্থ পরিশোধ করেন। অন্যদিকে প্রিপেইড ব্যবস্থায় আগে টাকা জমা দিতে হয় এবং সেই অর্থ থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি প্রযোজ্য বিভিন্ন চার্জ কেটে নেওয়া হয়।

এই পদ্ধতি নিয়ে গ্রাহকদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের আগেই অর্থ কেটে নেওয়া, লোডশেডিংয়ের সময়ও নির্ধারিত চার্জ পরিশোধ করতে হওয়া এবং রিচার্জের পর প্রত্যাশার তুলনায় কম অর্থ বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য অবশিষ্ট থাকার বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রিপেইড মিটার স্থাপন নিয়ে আপত্তি ও আন্দোলনের ঘটনাও ঘটেছে।

নারায়ণগঞ্জে প্রিপেইড মিটারবিরোধী সভা-সমাবেশ ও গণ-অনশনের মতো কর্মসূচির কথাও উঠে এসেছে। নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, গ্রাহকদের মধ্যে প্রিপেইড মিটার সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা ও আস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। তাদের মতে, নতুন ব্যবস্থা চালুর আগে এর সুবিধা, চার্জ কাঠামো এবং গ্রাহকের ওপর আর্থিক প্রভাব স্পষ্টভাবে জানানো জরুরি।

গ্রাহক অধিকারকর্মীদের পক্ষ থেকে ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, গ্রাহক যদি নিয়মিত ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ না পান, তাহলে অনুমোদিত লোডের জন্য নির্ধারিত চার্জের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। মিটার ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রেও মিটার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রকৃত ব্যয় এবং গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা ও গ্রাহকের আস্থার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একজন গ্রাহক যে লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ দিচ্ছেন, সেই সক্ষমতা অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে চার্জ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। এ কারণে ডিমান্ড চার্জের কাঠামো, বিতরণ ব্যয় এবং গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহের বাস্তবতা নিয়ে আরও স্বচ্ছ পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন তারা।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রিপেইড মিটারে পোস্টপেইডের তুলনায় অতিরিক্ত কোনো চার্জ আরোপ করা হয় না। প্রযোজ্য ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ একই নিয়মে কাটা হয়। কোনো গ্রাহক এককালীন মিটার কিনে না দিলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী মিটার ভাড়া নেওয়া হয়। বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, প্রিপেইড গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ বিলে নির্দিষ্ট হারে রিবেট বা ছাড়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে বড় একটি অংশের গ্রাহককে পর্যায়ক্রমে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বকেয়া বিলের ঝুঁকি কমানো, বিদ্যুৎ ব্যবহারে গ্রাহকের সচেতনতা বাড়ানো এবং বিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে নতুন প্রযুক্তি বা বিলিং ব্যবস্থা তখনই গ্রাহকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়, যখন সেটির নিয়ম ও আর্থিক হিসাব সহজভাবে বোঝানো যায়। প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের পর কোন খাতে কত টাকা কাটা হলো, কত টাকা বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য অবশিষ্ট থাকল এবং মাসিক ডিমান্ড চার্জ কীভাবে হিসাব হলো—এসব তথ্য গ্রাহকের কাছে পরিষ্কার থাকা জরুরি। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগও কমতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডিমান্ড চার্জ যাচাই-বাছাই করে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময়ও এই চার্জ বাড়ানো হয়নি। প্রিপেইড মিটার নিয়ে সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি পর্যালোচনা করে বড় কোনো সমস্যা পায়নি বলেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে মিটার ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে একজন গ্রাহকের মাসিক বিদ্যুৎ বিল বুঝতে শুধু কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে তা জানলেই হবে না। অনুমোদিত লোডের পরিমাণ, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া, ভ্যাট, আগের বকেয়া এবং বিলম্ব মাশুল—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এসব বিষয়ও মোট বিলের ওপর প্রভাব ফেলে। প্রিপেইড মিটারে এসবের কিছু অংশ রিচার্জের সময়ই কেটে নেওয়া হয় বলে গ্রাহকের কাছে হিসাবটি আরও আলাদাভাবে দৃশ্যমান হয়।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচের বাইরে নেওয়া বিভিন্ন চার্জ নিয়ে গ্রাহকদের প্রশ্ন থাকলেও পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে বিদ্যুৎ বিলের প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিতরণ সংস্থাগুলোরও চার্জের কাঠামো, ব্যয়ের ভিত্তি এবং গ্রাহকের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম আরও সহজ ভাষায় তুলে ধরা প্রয়োজন। এতে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিভ্রান্তি কমার পাশাপাশি গ্রাহক ও বিতরণ সংস্থার মধ্যে আস্থার সম্পর্কও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত