অনুমোদনের পরও থমকে আছে মাদারগঞ্জ সৌর প্রকল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
অনুমোদনের পরও থমকে আছে মাদারগঞ্জ সৌর প্রকল্প

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশোধিত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেলেও এখনও শুরু হয়নি কেন্দ্রটির মূল নির্মাণকাজ। প্রকল্প এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি। কাজের গতি থেমে থাকায় এসব সামগ্রী সংরক্ষণে বাড়ছে ব্যয়, পাশাপাশি চুরি ও নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

মাদারগঞ্জ উপজেলার জোড়খালী ইউনিয়নের কাইজার চর এলাকায় ৩২৫ দশমিক ৬৫ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ২০২২ সালে শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কেন্দ্রটি থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, যা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে প্রকল্প শুরুর পর বিভিন্ন কারণে এর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বন্যা, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং বিদেশি ঋণ ছাড়ে জটিলতার কারণে কাজের গতি কমে যায়। এক পর্যায়ে প্রকল্পের মূল ভারতীয় ইপিসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমরারাজা ইনফ্রা প্রাইভেট লিমিটেডকে নির্মাণসামগ্রী সরবরাহের কাজ বন্ধ রাখতে হয়। এরপর থেকে প্রকল্পের বড় ধরনের নির্মাণকাজ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা অর্থ পরিশোধের জটিলতার কারণে কাজের স্বাভাবিক গতি ফিরছে না। অথচ প্রকল্প এলাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দুটি বড় ব্যাচিং প্ল্যান্ট, প্রয়োজনীয় শ্রমিক-জনবল এবং বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী এখনও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব উপকরণ ব্যবহার না হওয়ায় এগুলোর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

প্রকল্পটির সঙ্গে শুধু সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণই নয়, বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজও রয়েছে। এই সঞ্চালন লাইনটি জামালপুরের প্রকল্প এলাকা থেকে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল গ্রিড উপকেন্দ্র পর্যন্ত যাওয়ার কথা। সঞ্চালন লাইনের বিভিন্ন টাওয়ার নির্মাণের উপকরণও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে পড়ে রয়েছে। ফলে এসব উপকরণ চুরি বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এরই মধ্যে গত ১৯ আগস্ট একনেকের সভায় ১ হাজার ৬১২ কোটি ৭৩ হাজার টাকা ব্যয়ে সংশোধিত প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আশা তৈরি হয়েছিল, এবার অর্থায়ন ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু হবে। কিন্তু অনুমোদনের প্রায় এক মাস পরও কেন্দ্রটির মূল নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পের অগ্রগতিতে আরেকটি বাধা ছিল বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টি। আগের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এএফআরওয়াই সুইজারল্যান্ড লিমিটেডের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় নতুন পরামর্শক নিয়োগ করা হয়নি। এতে প্রকল্পের বিভিন্ন কারিগরি ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত কাজেও প্রভাব পড়ে। পরে গত ২৫ আগস্ট ‘আটলানটা এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একেবারে কোনো কাজই হয়নি এমন নয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নদীভাঙন ঠেকাতে আরসিসি ব্লক স্থাপন করা হয়েছে। মাটি ভরাটের কাজও হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য ফ্রেম তৈরির কাজ এগিয়েছে। পাশাপাশি ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইনেরও বড় একটি অংশের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

তবে এসব কাজের পর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করা। কারণ কেন্দ্রের মূল অবকাঠামো, সৌর প্যানেল স্থাপন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কাজ শেষ না হলে ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া অবকাঠামো থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না।

প্রকল্পের কারণে স্থানীয় মানুষের জীবনেও পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণের পর নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ২৪১টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাদের জন্য ঘর নির্মাণের পাশাপাশি স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাজার, মসজিদ ও কবরস্থানসহ বিভিন্ন সুবিধা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পুনর্বাসন কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় এখনও কয়েকটি পরিবার সমস্যার মধ্যে রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রকল্পের কারণে অনেক পরিবার তাদের আগের বসতভিটা হারিয়েছে। পুনর্বাসনের মাধ্যমে নতুন আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও বাস্তবে সব পরিবার এখনও সমানভাবে সুবিধা পায়নি। এতে প্রকল্পের মূল কাজের পাশাপাশি পুনর্বাসন নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সবুরা খাতুন জানান, সাত সদস্যের পরিবারের জন্য একটি ঘর দেওয়া হয়েছে। এতজন মানুষের একসঙ্গে সেখানে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্য বেশি হওয়ায় ঘরটিতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা তাদের জন্য কষ্টকর বলে জানান তিনি।

আরেক বাসিন্দা পারুল বেগমের অভিযোগ, তিনি এখনও আশ্রয়ের ঘর পাননি। বৃষ্টি হলে তার বর্তমান বসতঘরের চারপাশে পানি জমে যায় এবং কখনও কখনও ঘরও পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে প্রকল্পের সুফলের অপেক্ষার পাশাপাশি পুনর্বাসনের সমস্যারও দ্রুত সমাধান চান স্থানীয়রা।

প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, প্রকল্পের ছোটখাটো কিছু কাজ চলমান রয়েছে। মূল নির্মাণকাজও শিগগির শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এটি শুরু হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। মূল কাজ শুরু হলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে দ্রুত প্রকল্পটি শেষ করার চেষ্টা করা হবে বলে তিনি জানান।

জামালপুরের জেলা প্রশাসক ইউসুপ আলী বলেন, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি দেওয়া হয়েছে। একনেকে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের পর প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ অবস্থায় মাদারগঞ্জের ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন হলে জাতীয় গ্রিডে নতুন একটি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎস যুক্ত হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের পরও যদি মূল নির্মাণকাজ শুরু হতে আরও সময় লাগে, তাহলে প্রকল্পের ব্যয় ও সময়—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকা নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা, পরামর্শক নিয়োগ এবং পুনর্বাসনের অসম্পূর্ণতা—সবগুলো বিষয় দ্রুত সমাধান করাই এখন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, একনেকের অনুমোদনের পর এবার আর দীর্ঘসূত্রতা থাকবে না। দ্রুত মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যাবে এবং জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ। একই সঙ্গে পুনর্বাসন নিয়ে যেসব পরিবার এখনও সমস্যায় রয়েছে, তাদের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা হবে। প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্টদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত