প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর কদমতলীতে একটি বাসার তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে ইয়ানূর বেগম (২৫) নামে এক নারীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার দুপুরে পাঁচতলা একটি ভবনের একটি ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে তাঁর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী জুয়েলকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত ইয়ানূর বেগম পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার গোয়াবাড়িয়া গ্রামের হানিফ হাওলাদারের মেয়ে। তিনি কদমতলীর ৬১ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার একটি পাঁচতলা ভবনের ফ্ল্যাটে স্বামীর সঙ্গে সাবলেট হিসেবে বসবাস করতেন। পারিবারিক কলহের মধ্যে তাঁর এমন মৃত্যু ঘিরে স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোক ও উদ্বেগ।
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন মাস আগে নিজেদের পছন্দে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন ইয়ানূর ও জুয়েল। জুয়েল পেশায় একটি বাসের সুপারভাইজার। বিয়ের পর থেকেই তাঁদের সংসারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কলহ চলছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে জানানো হয়েছে। ঘটনার আগের রাতেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল।
পরিবারের কাছে বিষয়টি আরও উদ্বেগের হয়ে ওঠে বৃহস্পতিবার রাতে। ওই রাতে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার কথা মুঠোফোনে নিজের মাকে জানিয়েছিলেন ইয়ানূর। এরপর কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তবে পরদিন সকালে ইয়ানূরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁর পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
শুক্রবার সকালে ইয়ানূরের ছোট ভাই ইমাম হোসেন একাধিকবার তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো সাড়া না পাওয়ায় তিনি বোনের বাসায় চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, যে কক্ষটিতে ইয়ানূর ও তাঁর স্বামী থাকতেন, সেটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ।
পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হলে ইমাম হোসেন তালা ভেঙে কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকেই তিনি মেঝেতে রক্তের দাগ দেখতে পান। এতে তাঁর সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। পরে কক্ষের ভেতরে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে খাটের নিচে ইয়ানূরের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান তিনি। এরপর দ্রুত পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কদমতলী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ কক্ষটি পরিদর্শন করে এবং খাটের নিচ থেকে ইয়ানূরের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়।
কদমতলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কামরুন নাহার জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ধারালো কোনো অস্ত্র দিয়ে ইয়ানূরের গলা কেটে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ঘটনার পর ইয়ানূরের স্বামী জুয়েল পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর অবস্থান শনাক্ত ও তাঁকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত এবং পারিবারিক বিরোধের বিষয়গুলোও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়ানূরের এটি প্রথম বিয়ে ছিল না। এর আগে তাঁর আরেকটি বিয়ে হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ওই সংসারের বিচ্ছেদ ঘটে। আগের সংসারে তাঁর পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। শিশুটি বর্তমানে ইয়ানূরের বাবা-মায়ের কাছে থাকে।
মাত্র তিন মাস আগে নতুন করে সংসার শুরু করেছিলেন ইয়ানূর। স্বজনদের কাছে সংসারজীবনের নানা বিষয় নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ও দাম্পত্য কলহের কথা উঠে এসেছে। ঘটনার আগের রাতে মায়ের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা বলার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই ফোনালাপে তিনি ঠিক কী জানিয়েছিলেন, তা পরিবারের কাছ থেকে বিস্তারিতভাবে জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
একটি পরিবারের জন্য প্রিয়জনের আকস্মিক মৃত্যু যেমন গভীর শোকের, তেমনি এমন একটি ঘটনার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ও দাম্পত্য জীবনের নানা প্রশ্ন জড়িয়ে থাকায় তদন্তের প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মৃত্যুর আগে ইয়ানূর তাঁর মাকে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার কথা জানিয়েছিলেন—এই তথ্য ঘটনার সময়রেখা অনুসন্ধানে পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
তবে পারিবারিক কলহের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কারণ বা কারও দায় নিশ্চিতভাবে যুক্ত করার আগে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করা প্রয়োজন। পুলিশও প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করবে।
এদিকে ইয়ানূরের স্বজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। সকালে বোনকে ফোনে না পেয়ে বাসায় এসে ভাই যে পরিস্থিতি দেখতে পান, তা পরিবারের সদস্যদের জন্য ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। তালাবদ্ধ কক্ষের ভেতর রক্তের দাগ এবং পরে খাটের নিচে মরদেহ পাওয়ার ঘটনা পুরো বিষয়টিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর ধরন ও আঘাতের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং ইয়ানূরের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা। ইয়ানূরের পরিবারের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত এবং প্রযুক্তিগত তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় যাচাই করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ঘটনায় কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়ী হিসেবে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে না।