প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আট দফা দাবি সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু হয়েছে। শনিবার সকাল ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে সকাল ৮টার দিকে রংপুরের উদ্দেশে লংমার্চের গাড়িবহর যাত্রা শুরু করে। কর্মসূচিতে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, প্রশাসনে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি রয়েছে।
এটি ১১ দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক বড় কর্মসূচির দ্বিতীয় লংমার্চ। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে ছয় দফা দাবিতে লংমার্চ করেছিল জোটটি। এবার জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন দাবির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে ঢাকার বাইরে একটি আঞ্চলিক ইস্যুকেও কর্মসূচির রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে যুক্ত করেছে জোটটি।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের উদ্বোধনী সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকসহ জোটের অন্যান্য নেতারা। সমাবেশ শেষে রংপুরের উদ্দেশে লংমার্চের যাত্রা শুরু হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত লংমার্চের গাড়িবহরে এক হাজারের বেশি যানবাহন যুক্ত হতে পারে। পথে বিভিন্ন জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা বহরকে স্বাগত জানাবেন বলে জানিয়েছে জোট। একই সঙ্গে রংপুরে বড় সমাবেশ করার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। তবে আয়োজকদের দেওয়া অংশগ্রহণের বিভিন্ন হিসাব তাদের নিজস্ব প্রত্যাশা ও দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে; চূড়ান্ত উপস্থিতির সংখ্যা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
লংমার্চের পথে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস, টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ বাইপাস, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়, বগুড়ার মাটিডালির বিমান মোড় এবং গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভা হওয়ার কথা রয়েছে। দিনব্যাপী যাত্রার পর সন্ধ্যায় রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচির সময় ও পথপরিক্রমায় পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলেও আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত আট দফার মধ্যে প্রথম দিকে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচার। এর সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসনের দাবি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধের বিষয়ও রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবি জানানো হয়েছে। প্রশাসনে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিও কর্মসূচিতে রাখা হয়েছে। সর্বশেষ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি আট দফার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে সামনে এসেছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের আলোচিত একটি বিষয়। নদীভাঙন, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও নদী-নির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে তিস্তা অববাহিকার মানুষের নানা বাস্তব সমস্যা জড়িয়ে রয়েছে। এ কারণে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি রংপুরমুখী কর্মসূচিতে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। জোটের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের মানুষের দাবিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে আনার উদ্দেশ্যেই এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
লংমার্চ ঘিরে রাজধানী থেকে রংপুর পর্যন্ত সড়কপথে যান চলাচল ও সাধারণ মানুষের চলাফেরায় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ বিষয়ে জোটের নেতারা আগেই সাধারণ মানুষের সম্ভাব্য দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছেন তাঁরা, যাতে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যায়। লংমার্চে অংশ নেওয়া নেতা-কর্মীদেরও উসকানির মুখে ধৈর্য ও সংযম দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এর আগে জানিয়েছিলেন, কর্মসূচিতে এক হাজারের বেশি গাড়ি যুক্ত হতে পারে। তিনি সরকারের প্রতি লংমার্চে বাধা না দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কোনো ধরনের উসকানিতে না জড়িয়ে কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন। এসব বক্তব্যকে জোটের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মসূচি পরিচালনার ঘোষণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে জাতীয় রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে তিস্তা নদী ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বক্তব্য আসতে পারে। রংপুরে কর্মসূচিটির আকার ও মানুষের অংশগ্রহণ জোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে সমাবেশে প্রকৃত উপস্থিতির সংখ্যা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাত্রা কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরই নির্ভরযোগ্যভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এর আগে চট্টগ্রামমুখী লংমার্চে যে ছয়টি দাবি সামনে রাখা হয়েছিল, রংপুরের কর্মসূচিতে তার সঙ্গে আরও দুটি বিষয় যুক্ত হয়েছে। ফলে এবার দাবির পরিধি জাতীয় অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয় থেকে শুরু করে দুর্নীতি, দখলদারি, চাঁদাবাজি এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো ইস্যু পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ১১ দলীয় ঐক্য তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচিতে জাতীয় ও আঞ্চলিক—দুই ধরনের বিষয়কে একসঙ্গে সামনে রাখছে।
জোটের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, রংপুরের পর খুলনা ও সিলেট অভিমুখেও লংমার্চের কর্মসূচি রয়েছে। ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। চার অঞ্চলে ধারাবাহিক লংমার্চের মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক ও স্থানীয় ইস্যুকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জোটের নেতারা জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে শনিবারের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ ১১ দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে সামনে এসেছে। একদিকে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন দাবি, অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা ইস্যুকে সামনে রেখে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সড়কপথে জনদুর্ভোগ ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কর্মসূচির শেষ পর্বে রংপুর জিলা স্কুল মাঠের সমাবেশে জোটের নেতারা কী ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দেন এবং পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে কী ঘোষণা আসে, সেদিকেও নজর থাকবে।