লংমার্চে বিএনপির নজর, গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
লংমার্চে বিএনপির নজর, গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকটসহ বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১–দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচিকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলো রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করলেও আপাতত এর পাল্টা কোনো কর্মসূচি দেওয়ার প্রয়োজন দেখছে না ক্ষমতাসীন বিএনপি। তবে বিরোধীদের কর্মসূচির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, জনসম্পৃক্ততা এবং ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচির ওপর দলটি নজর রাখছে। সংসদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে এসব কর্মসূচির জবাব দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত লংমার্চকে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে না বিএনপি। সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টা কর্মসূচি নেওয়ার বদলে যেসব সমস্যা সামনে রেখে বিরোধীরা মাঠে নেমেছে, সেসব সমস্যার সমাধানে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।

শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ১১–দলীয় ঐক্যের রংপুর অভিমুখী লংমার্চ শুরু হয়েছে। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর একই জোট জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের সমাধান, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করে। পর্যায়ক্রমে খুলনা, সিলেটসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহর অভিমুখেও একই ধরনের কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে জোটটি।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিরোধীদের কর্মসূচি সম্পর্কে বলেছেন, বিএনপি লংমার্চকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবেই দেখছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার অধিকার সবার রয়েছে এবং বিএনপি বিষয়টিকে সেই দৃষ্টিতেই দেখছে।

দলটির এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, আপাতত রাজপথে পাল্টা শক্তি প্রদর্শনের কৌশলে যেতে চাইছে না বিএনপি। বরং সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করেন, সরকারে থাকা অবস্থায় বিরোধী দলের প্রতিটি কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি দিলে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং জনদুর্ভোগও তৈরি হতে পারে।

তবে বিএনপির ভেতরে এ বিষয়ে পুরোপুরি একমত অবস্থানও নেই। দলের একটি অংশ মনে করছে, বিরোধীরা যদি জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকে, তাহলে সেসব কর্মসূচিকে দীর্ঘ সময় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এবং আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব ইস্যুতে বিরোধীদের রাজনৈতিক বক্তব্য যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনও তত বাড়তে পারে।

১১–দলীয় ঐক্যের নেতারা অবশ্য দাবি করছেন, তাঁদের কর্মসূচির লক্ষ্য সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা এবং জনজীবনের সমস্যাগুলো সামনে আনা। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকটকে কেন্দ্র করে তাঁরা সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করছেন। প্রথম দফার লংমার্চের বিভিন্ন পথসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানসহ অন্য নেতারা বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।

ফেনীর মহিপালের পথসভায় শফিকুর রহমান সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেন এবং বাধা এলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেন। তাঁর এসব বক্তব্যের মাধ্যমে বিরোধী জোটের কর্মসূচির রাজনৈতিক ভাষা যে ক্রমেই কঠোর হচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি এখনো একই ধরনের পাল্টা কর্মসূচিতে না গিয়ে সংসদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে বিষয়গুলোর মোকাবিলা করছে।

বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও পাল্টা বক্তব্য এসেছে। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ প্রশ্ন তুলেছেন, বিএনপি যদি বিরোধীদের কর্মসূচিকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে সংসদে বা রাজনৈতিক বক্তব্যে কেন তার প্রতিক্রিয়া জানায়। তাঁর বক্তব্যে বিএনপির রাজনৈতিক সক্ষমতা ও অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এদিকে লংমার্চের উদ্দেশ্য নিয়েও বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকট সমাধানের দাবিতে গাড়িবহর নিয়ে লংমার্চ আয়োজনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করা যেত, তাহলে সরকারই আগে এমন কর্মসূচি আয়োজন করত। তাঁর বক্তব্যে লংমার্চের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যার সমাধান কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

সরকারি দলের অন্যান্য নেতারাও বিরোধীদের কর্মসূচির সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে একদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বাস্তবতা তুলে ধরা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ও সামনে আনা হচ্ছে। ফলে একই ইস্যুকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাল্টাপাল্টি তৈরি হয়েছে।

তবে বিএনপির সামনে এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দলের সাংগঠনিক তৎপরতা। বিরোধী দলগুলো যখন ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, তখন ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশ বর্তমানে সরকার, সংসদ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত। ফলে দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকা অবস্থায় যে ধরনের রাজপথকেন্দ্রিক সাংগঠনিক তৎপরতা দেখা যেত, ক্ষমতায় আসার পর সেই চিত্র বদলেছে।

সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক প্রস্তুতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় হলেও কেন্দ্রীয়ভাবে বড় ধরনের মাঠকর্মসূচি এখনো দৃশ্যমান নয়। ফলে বিরোধীদের ধারাবাহিক কর্মসূচির পাশাপাশি বিএনপির নিজস্ব সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জায়গা থেকে বিষয়টি দেখলে, ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চের তাৎক্ষণিক প্রভাব শুধু কর্মসূচির জনসমাগমে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে বিরোধী দলগুলো একাধিক জনসম্পৃক্ত ইস্যুকে একই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসছে। অন্যদিকে বিএনপি এসব কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি না দিয়ে সরকারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশল নিয়েছে।

এই দুই ভিন্ন কৌশলের মধ্যে কোনটি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনই নির্ধারণ করার সুযোগ নেই। তবে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এসব ইস্যুতে সরকারের পদক্ষেপ এবং বিরোধীদের ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি—দুটিই জনআলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ঢাকা থেকে রংপুরের পথে ১১–দলীয় ঐক্যের এবারের লংমার্চ সেই রাজনৈতিক আলোচনাকেই আরও বিস্তৃত করেছে। বিএনপি কর্মসূচিটির ওপর নজর রাখছে এবং আপাতত পাল্টা কর্মসূচিতে না যাওয়ার অবস্থানে রয়েছে। তবে বিরোধীরা যদি ধারাবাহিকভাবে জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে রাজপথে সক্রিয় থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারের রাজনৈতিক যোগাযোগ, সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ এবং বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতার ওপরও বাড়তি গুরুত্ব পড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত