মেট্রোরেল ব্যয়ে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির দাবি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
মেট্রোরেল ব্যয়ে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির দাবি

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার ক্রমবর্ধমান যানজট ও জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে মেট্রোরেলকে আধুনিক গণপরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এর নির্মাণব্যয়, ঋণের চাপ এবং সামগ্রিক পরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মেট্রোরেল প্রকল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পাশাপাশি বিকল্প গণপরিবহনব্যবস্থার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।

শুক্রবার আয়োজিত ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা’ শীর্ষক এক অনলাইন সেমিনারে পরিকল্পনাবিদ, পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা এসব মতামত তুলে ধরেন। তাদের আলোচনায় উঠে আসে, ঢাকার পরিবহন সংকটের সমাধান শুধু নতুন নতুন মেট্রোরেল নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হলে শহরের বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের চাহিদা পূরণে সমস্যা থেকে যেতে পারে। তাই মেট্রোরেলের পাশাপাশি বাস, বিআরটি, কমিউটার রেল, হাঁটার উপযোগী ফুটপাত ও সাইকেল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবহনকে সমন্বিতভাবে উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়, ঋণের কিস্তি, সরকারি ভর্তুকি এবং যাত্রীদের কাছ থেকে সম্ভাব্য আয়—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের প্রকৃত আর্থিক চাপ নিরূপণ করা দরকার। কারণ একটি প্রকল্প নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও বহু বছর ধরে তার পরিচালনা ও ঋণ পরিশোধের দায় রাষ্ট্রের ওপর থাকে। ফলে প্রকল্প গ্রহণের সময় কেবল নির্মাণ শেষ করার বিষয়টি বিবেচনা না করে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে রাখা জরুরি।

আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মূল প্রবন্ধে বলেন, মেট্রোরেলের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কারণে ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার অন্যান্য সম্ভাবনা উপেক্ষিত হচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় বাস যোগাযোগ, বাস দ্রুতগতির পরিবহনব্যবস্থা এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও এসব খাতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ হয়নি। বিপরীতে পরবর্তী সময়ে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সাম্প্রতিক আলোচনায় মেট্রোরেল লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রকল্প দুটির নির্মাণ ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির পর্যালোচনাতেও ডলারের বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি, কর কাঠামোর পরিবর্তন ও নকশাগত পরিবর্তনের মতো কারণের প্রভাবের কথা এসেছে। অন্যদিকে আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণের পাশাপাশি দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার মাত্রা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

আইপিডির মতে, বড় প্রকল্পে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা গেলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয় এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পের প্রতিটি প্যাকেজের দরপত্র, চুক্তি, ব্যয় এবং সময়সীমার তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করলে প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি বাড়তে পারে।

পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, বর্তমানে মেট্রোরেলের মাধ্যমে ঢাকার মোট যাতায়াতের তুলনামূলক ছোট একটি অংশ সম্পন্ন হচ্ছে। ভবিষ্যতে পরিকল্পিত সব মেট্রোরেল চালু হলেও শহরের সব যাত্রীর পরিবহন চাহিদা মেট্রোরেল দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য কার্যকর বাস নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এই বাস্তবতায় বাসব্যবস্থার সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকার বিপুলসংখ্যক বিচ্ছিন্ন বাসকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় এনে কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালনার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। এর মাধ্যমে রুট ব্যবস্থাপনা, সময়সূচি, ভাড়া আদায় ও যাত্রীসেবায় শৃঙ্খলা আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সেমিনারে আরও বলা হয়, ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে পর্যাপ্ত সমন্বয় না থাকা। একটি মেট্রো স্টেশনে যাত্রী পৌঁছানোর পর তার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য সহজে বাস, কমিউটার ট্রেন, হাঁটার পথ বা সাইকেলপথ পাওয়া না গেলে মেট্রোরেলের সুবিধাও সীমিত হয়ে পড়ে। তাই মেট্রো স্টেশন, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন এবং পথচারী অবকাঠামোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করা জরুরি।

আইপিডির পক্ষ থেকে তেজগাঁও, বনানী, মহাখালী ও টঙ্গী করিডোরে বিদ্যমান রেলপথ উন্নত করে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির কমিউটার ট্রেন চালুর সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্বাচল, উত্তরা, কেরানীগঞ্জ ও সাভার-ধামরাইয়ের মতো এলাকাগুলোকে পরিকল্পিত উপকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবও এসেছে। এতে রাজধানীমুখী অতিরিক্ত যাতায়াতের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন পরিকল্পনাবিদরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় যৌক্তিক ও ন্যায্য কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, শুধু প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় গ্রহণ করলেই হবে না; স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করা প্রয়োজন।

আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বারবার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি প্রকল্প পরিকল্পনা, প্রাথমিক ব্যয় প্রাক্কলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেন। জনগণের অর্থ ও বৈদেশিক ঋণের অর্থে পরিচালিত প্রকল্পে ব্যয় সংশোধনকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে প্রতিটি সংশোধনের কারণ খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় মেট্রোরেলের পাশাপাশি বিআরটি, লাইট রেল, কমিউটার রেল ও উন্নত বাসসেবার মতো তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল বিকল্পের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কোনো একটি পরিবহন পদ্ধতিকে আগে থেকে নির্ধারিত সমাধান হিসেবে না দেখে প্রতিটি করিডোরের যাত্রী চাহিদা, নির্মাণ ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ বছরের পরিচালন ব্যয়, ঋণের কিস্তি, সম্ভাব্য সরকারি ভর্তুকি এবং টিকিট থেকে সম্ভাব্য আয় প্রকাশের সুপারিশ করেছে আইপিডি। পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় একাধিকবার বাড়লে তার কারণ অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে চলমান এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—ঢাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে, সাশ্রয়ী ও টেকসইভাবে পূরণ করা সম্ভব। মেট্রোরেল সেই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, তবে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে যে শুধু বড় প্রকল্প বাড়ালেই পরিবহন সংকটের পূর্ণ সমাধান নাও হতে পারে।

তাই ভবিষ্যৎ পরিবহন পরিকল্পনায় প্রকল্পের আকারের পাশাপাশি মানুষের বাস্তব যাতায়াতের প্রয়োজন, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, ঋণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং বিভিন্ন পরিবহনমাধ্যমের পারস্পরিক সংযোগকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, স্বাধীন ব্যয় যাচাই, স্বচ্ছ দরপত্র এবং সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে ঢাকার গণপরিবহন উন্নয়নে বিনিয়োগের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি—দুই দিকেই অগ্রগতি আনা সম্ভব হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত