প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মারধরের পর আজমল (৩৫) নামের এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। শুক্রবার দিবাগত রাতে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন একটি ভবনের চতুর্থ তলার ছাদে ওই যুবককে কয়েকজন মারধর করেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় নিচে পড়ে থাকা আজমলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহত আজমল হরিণটানা এলাকার কুতুবের ছেলে। তার মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কীভাবে তিনি ভবনের চতুর্থ তলা থেকে নিচে পড়ে গেলেন, তার আগে সেখানে কী ঘটেছিল এবং তার শরীরে থাকা আঘাতের চিহ্নের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক কী—এসব বিষয় এখন তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে কয়েকজন যুবক গুরুতর আহত অবস্থায় আজমলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তারা নিজেদের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই আজমলের মৃত্যু হয়।
হাসপাতালে নেওয়ার সময় সঙ্গে থাকা যুবকেরা কর্তৃপক্ষকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটি ভবনের চতুর্থ তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আজমল আহত হয়েছেন। তাদের দেওয়া এই বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনায় কিছু পার্থক্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় কয়েকজন বাড়ির মালিক দাবি করেছেন, তারা ভবনের ছাদে আজমলকে কয়েকজনের মারধরের দৃশ্য দেখেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার দিকে পাশের একটি ভবন থেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পান তারা। শব্দ শুনে কয়েকজন বাড়ির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দা বাইরে বেরিয়ে আসেন। তখন তারা ওই ভবনের চতুর্থ তলার ছাদে কয়েকজন ব্যক্তিকে একজনকে মারধর করতে দেখেন বলে দাবি করেন।
কিছুক্ষণ পর নিচে একজনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, নিচে পড়ে থাকা ব্যক্তিই ছিলেন আজমল। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি পানি চাইলে স্থানীয় কয়েকজন তাকে পানি দেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে কয়েকজন তাকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, আজমলের শরীরে বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। তার মাথার চুলের এক পাশও কাটা ছিল বলে হাসপাতাল সূত্রের বরাতে জানা গেছে। এসব আঘাত কীভাবে হয়েছে, তিনি ভবন থেকে পড়ে আহত হওয়ার আগে কোনো ধরনের মারধরের শিকার হয়েছিলেন কি না এবং মৃত্যুর সঙ্গে এসব আঘাতের সম্পর্ক কতটা—তা নিশ্চিত হতে তদন্ত প্রয়োজন।
আজমলকে হাসপাতালে নিয়ে আসা যুবকেরা তার মৃত্যুর পর দ্রুত হাসপাতাল থেকে চলে যান বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। ফলে ওই সময় তাদের পরিচয়, ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতির কারণ এবং আজমলকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও আশপাশের আবাসিক ভবনগুলোতে রাতের সময় এমন একটি ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং হাসপাতালের পর্যবেক্ষণের বাইরে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, আজমলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তার শরীরে আঘাতের ধরন, ভবন থেকে পড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি, ঘটনার আগে ও পরে কী ঘটেছিল এবং কারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। নিহতের মরদেহ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ দেওয়া হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মরদেহ ময়নাতদন্ত করা হলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ভবন থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে মৃত্যু হয়েছে, নাকি তার আগে কোনো ধরনের শারীরিক আঘাতের কারণে তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন—এ বিষয়ে চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, ভবনের ছাদে কারা ছিলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা ঠিক কী দেখেছেন এবং হাসপাতালে আজমলকে কারা নিয়ে এসেছিলেন—এসব তথ্যও তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাস্থল থেকে কোনো আলামত পাওয়া গেলে সেগুলো পরীক্ষা করেও ঘটনার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
আজমলের মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাদের কারও বিরুদ্ধে অপরাধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ, হাসপাতালের নথি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে ময়নাতদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হবে।
স্থানীয়দের জন্যও ঘটনাটি গভীর উদ্বেগের। রাতের নীরবতায় একটি ভবন থেকে চিৎকার শোনা, পরে একজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু—পুরো ঘটনাটি এলাকায় শোক ও উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। নিহতের পরিবারের জন্যও আকস্মিক এই মৃত্যু বড় ধরনের আঘাত হয়ে এসেছে।
একজন মানুষের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন শুধু আইনগত বিষয় নয়, তার পরিবারের কাছে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ভূমিকা নির্ধারণের পাশাপাশি মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ বের করাও জরুরি।
এ ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিরপেক্ষ তদন্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, হাসপাতালের তথ্য, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ময়নাতদন্তের ফলাফল এবং ঘটনাস্থলের আলামত—সবকিছু সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করলেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে আজমল কী পরিস্থিতিতে আহত হয়েছিলেন এবং তার মৃত্যুর জন্য দায়ী পরিস্থিতি বা ব্যক্তিদের বিষয়ে কী তথ্য পাওয়া যায়। আপাতত ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য থাকলেও চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করছে।