টায়ার আমদানিতে বড় উল্লম্ফন, বাড়ছে নির্ভরতা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
টায়ার আমদানিতে বড় উল্লম্ফন, বাড়ছে নির্ভরতা

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের টায়ারের আমদানি গত দুই বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, বাস ও ট্রাকের প্রায় ৬৪ লাখ টায়ার আমদানি করা হয়েছিল। দুই বছর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই আমদানির পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৯৬ লাখে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে টায়ার আমদানি বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।

আমদানির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশ থেকে টায়ার আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে টায়ার আমদানির পেছনে অতিরিক্ত প্রায় ৪২৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে টায়ারের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়তে না পারাই আমদানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গাজী গ্রুপের টায়ার কারখানাগুলো উৎপাদনের বাইরে চলে যাওয়ায় বাজারে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। অন্য কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করলেও সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাজারের চাহিদা মেটাতে বিদেশি টায়ারের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

দেশে বর্তমানে মেঘনা গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল, রূপসা টায়ারস অ্যান্ড কেমিক্যালস, এপেক্স হোসেন টায়ার, যমুনা গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টায়ার উৎপাদন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের উৎপাদন রিকশা, ভ্যান ও বাইসাইকেলের টায়ারকেন্দ্রিক। পাশাপাশি মোটরসাইকেল, সিএনজি, পিকআপসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের টায়ারও দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। তবে ভারী যানবাহনের টায়ারের ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদন এখনো তুলনামূলক সীমিত।

এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাস ও ট্রাকের টায়ার আমদানির পরিমাণও গত দুই বছরে দ্রুত বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ ধরনের প্রায় ৩৯ লাখ টায়ার আমদানি হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই সংখ্যা বেড়ে ৫৭ লাখ ৫১ হাজারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এই শ্রেণির টায়ার আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ।

মোটরসাইকেলের টায়ারের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৭ লাখ ৬৩ হাজার মোটরসাইকেলের টায়ার আমদানি হয়েছিল। দুই বছর পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৪১ হাজারে। এতে মোটরসাইকেলের টায়ার আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে বাইসাইকেলের টায়ার আমদানিতে। দুই বছরের ব্যবধানে এ ধরনের টায়ার আমদানি ৬৪ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে প্রায় ১০ লাখ ৫৫ হাজার বাইসাইকেলের টায়ার আমদানি হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ১৭ লাখে পৌঁছেছে।

দেশীয় টায়ার শিল্পে গাজী গ্রুপের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রিকশা, তিন চাকার যান এবং ছোট বাণিজ্যিক যানবাহনে ব্যবহৃত টায়ারের বাজারের বড় অংশ তাদের উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ হতো। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব যানবাহনের টায়ারের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত গাজী টায়ার সরবরাহ করত। বাস ও ট্রাকের টায়ারের বাজারেও তাদের অংশ ছিল প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। এ ছাড়া মিনিবাসের টায়ারের চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করত প্রতিষ্ঠানটি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গাজী টায়ারের দুটি কারখানায় লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। কারখানাগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টায়ার ও টিউব। ফলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়। অন্যদিকে চাহিদা অব্যাহত থাকায় সেই ঘাটতি পূরণে আমদানির পথ বেছে নিতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গাজী টায়ার ও গাজী অটো টায়ারের মাধ্যমে প্রায় ৪৯১ কোটি টাকার টায়ার-টিউব বিক্রি হয়েছিল। উৎপাদনে ফিরতে না পারলেও প্রতিষ্ঠান দুটি আমদানির মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

দেশীয় উৎপাদকদের মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও টায়ার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হবিগঞ্জ শিল্পপার্কে প্রতিষ্ঠানটি রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, সিএনজি, মিশুক এবং দেড় টনের ট্রাকের জন্য বিভিন্ন ধরনের টায়ার উৎপাদন করছে। তাদের মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮ লাখ পিস। তবে মোট উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই সাইকেল, রিকশা ও ভ্যানের টায়ার। ফলে বাস ও ট্রাকের মতো বড় যানবাহনের টায়ারের বাজারে দেশীয় উৎপাদনের অংশ এখনো তুলনামূলক কম।

চাহিদা বাড়ায় বাস ও ট্রাকের টায়ার উৎপাদনের দিকেও এগোতে চায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। আরএফএল গ্রুপের বিপণন বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণ করে বড় যানবাহনের টায়ার উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টায়ারের বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও অটোরিকশা ও অন্যান্য তিন চাকার যানবাহনের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে টায়ারের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়নি।

টায়ার উৎপাদনে গ্যাসের প্রয়োজন হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিও শিল্পটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে অর্থনৈতিক ও শিল্প পরিস্থিতির কারণে নতুন বিনিয়োগের গতি কম ছিল। ফলে বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে আমদানিতে।

রূপসা টায়ারস অ্যান্ড কেমিক্যালসও সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯১ সালে টায়ারের ব্যবসায় আসে। ২০১৭ সালের আগে মূলত রিকশা, ভ্যান ও বাইসাইকেলের টায়ার উৎপাদন করলেও পরে মোটরচালিত যানবাহনের জন্য টায়ার উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক প্রায় ৮ হাজার টায়ার এবং ৩০ হাজার টিউব উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। দুই বছর আগের তুলনায় তাদের উৎপাদন সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মতে, মোটরসাইকেলের বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে টায়ারের চাহিদাও বাড়ছে। দেশীয় কোম্পানিগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেও একই সময়ে বিদেশি টায়ারের প্রবেশও বেড়েছে। দেশে বিদেশি ব্র্যান্ডের টায়ারের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ এবং মোটরসাইকেল উৎপাদন ও সংযোজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমদানির কারণেও বাজারে বিদেশি টায়ারের চাহিদা তৈরি হচ্ছে।

বিশেষ করে ভারতীয় মোটরসাইকেলের বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে ভারত থেকে টায়ার আমদানির বিষয়টিও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন। পাশাপাশি কিছু ক্রেতার কাছে বিদেশি টায়ারের মান ও ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতা বেশি হওয়ায় দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিও অব্যাহত রয়েছে।

তবে বাস ও ট্রাকের মতো ভারী যানবাহনের টায়ার দেশে উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। উদ্যোক্তাদের মতে, এ ধরনের টায়ারের বাজার তুলনামূলক সীমিত হওয়ায় বিনিয়োগের ঝুঁকিও বেশি। তারপরও আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।

সরকারও টায়ার আমদানি কমিয়ে স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করার বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে টায়ার শিল্পে নীতিগত পরিবর্তন আনার উদ্যোগ রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে দেশীয় উৎপাদন বাড়লে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে, অন্যদিকে স্থানীয় শিল্পে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই দেশের টায়ার শিল্পের সামনে একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে দ্রুত বাড়ছে যানবাহন ও টায়ারের চাহিদা, অন্যদিকে সেই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। গাজী গ্রুপের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তৈরি হওয়া ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে দেশীয় উৎপাদকদের সামনে কঠিন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন বিনিয়োগ ও সঠিক নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় টায়ার শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত