সুইডেনে নির্বাচনের পর সরকার গঠনে কঠিন সমীকরণ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ বার
সুইডেনে নির্বাচনের পর সরকার গঠনে কঠিন সমীকরণ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সুইডেনের জাতীয় নির্বাচনে মধ্য-বামপন্থী বিরোধী জোট অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর দেশটিতে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নির্বাচনে ৩৪৯ আসনের রিক্সড্যাগে বিরোধী জোট ১৭৬টি আসন পেয়েছে, যেখানে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসনের নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী জোট পেয়েছে ১৭৩টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৭৫টি আসন। ফলে বিরোধী জোট মাত্র তিনটি আসনের ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সুইডেনের মধ্য-ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন পদত্যাগ করেন। এরপর পার্লামেন্টের স্পিকার আন্দ্রেয়াস নোরলেন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ম্যাগডালেনা অ্যান্ডারসনকে নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা যাচাই ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করার দায়িত্ব দিয়েছেন। সুইডিশ পার্লামেন্টও জানিয়েছে, অ্যান্ডারসনকে এমন একটি সরকার গঠনের সম্ভাবনা খুঁজে দেখতে বলা হয়েছে, যা রিক্সড্যাগে প্রয়োজনীয় সমর্থন বা গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে।

অ্যান্ডারসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই জোটের মধ্যে থাকা চারটি দলের রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে বামপন্থি লেফট পার্টি, পরিবেশবাদী গ্রিন পার্টি এবং মধ্যপন্থি সেন্টার পার্টি মিলে ১৭৬টি আসন পেয়েছে। কাগজে-কলমে এই সংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট হলেও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে চার দলের মধ্যে নীতিগত সমঝোতা কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে লেফট পার্টি ও সেন্টার পার্টির অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য সরকার গঠনের আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে। লেফট পার্টি তাদের সমর্থনের বিনিময়ে সরকারের অংশ হওয়ার দাবি তুলেছে। অন্যদিকে সেন্টার পার্টি জানিয়েছে, তারা লেফট পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে গঠিত কোনো সরকারকে সমর্থন করতে আগ্রহী নয়। ফলে অ্যান্ডারসনকে এমন একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংসদীয় সমর্থন নিশ্চিত করা এবং শরিক দলগুলোর ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান সামলানো সম্ভব হয়।

সুইডেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জোট ও সংখ্যালঘু সরকার গঠন অস্বাভাবিক নয়। দেশটির পার্লামেন্টে সাধারণত একাধিক দলের সমর্থনের ওপর সরকারকে নির্ভর করতে হয়। ফলে কোনো একটি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছালেই সরকার গঠন নিশ্চিত হয়ে যায় না; বরং সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রস্তাবিত নীতির প্রতি প্রয়োজনীয় সমর্থন ধরে রাখার জন্য দলগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক সমঝোতা প্রয়োজন হয়।

এবারের নির্বাচনের ফলও সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। বিরোধী জোট ১৭৬টি আসন পেলেও চার দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে করনীতি, জ্বালানি ও পরিবেশনীতি, অভিবাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। ফলে অ্যান্ডারসনকে শুধু প্রধানমন্ত্রী পদে সংসদীয় সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করলেই হবে না, সরকার পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিও তৈরি করতে হবে।

নির্বাচনের পর অ্যান্ডারসন জানিয়েছেন, তিনি নতুন সরকার গঠনের বিষয়ে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে চান। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি দেশের স্বার্থ ও জনগণের অগ্রাধিকারকে সামনে রেখে দলীয় কৌশলের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক নেত্রীর সামনে এখন মূল কাজ হলো নির্বাচনে পাওয়া আসনকে কার্যকর রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তর করা।

অন্যদিকে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টারসনের নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী জোট ১৭৩টি আসন পেয়েছে। নির্বাচনের ফল নিশ্চিত হওয়ার পর ক্রিস্টারসন পদত্যাগ করেন এবং সরকার গঠনের পরবর্তী প্রক্রিয়ার দায়িত্ব পার্লামেন্টের স্পিকারের হাতে চলে যায়। ফলে এখন অ্যান্ডারসনের আলোচনাই সুইডেনের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সুইডেনের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে অভিবাসন, অপরাধ দমন, অর্থনীতি, জলবায়ু ও জ্বালানি নীতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। নতুন সরকার এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করবে, তা নির্ভর করবে সরকার গঠনের সময় বিভিন্ন দলের মধ্যে কী ধরনের সমঝোতা হয় তার ওপর। বিশেষ করে গত সরকারের তুলনায় অভিবাসন ও অপরাধনীতিতে পরিবর্তন আনার বিষয়ে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান আলোচনায় রয়েছে। তবে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সমঝোতার ধরন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নতুন সরকারের নীতিগত কাঠামো সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

নির্বাচনে সুইডেন ডেমোক্র্যাটসের ফলও দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। দলটি আগের নির্বাচনের তুলনায় সমর্থন হারিয়েছে এবং এবার আর সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল থাকেনি। বিদায়ী সরকারের সময় দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভায় না থেকেও বাজেট ও বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। নতুন নির্বাচনী ফলের পর সেই রাজনৈতিক সমীকরণেও পরিবর্তন এসেছে।

তবে নির্বাচনে জয় পাওয়ার অর্থ এই নয় যে নতুন সরকার ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়ে গেছে। সুইডেনের সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের জন্য এমন প্রার্থী প্রয়োজন, যার বিরুদ্ধে রিক্সড্যাগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ভোট দেন না। ফলে অ্যান্ডারসনের সামনে সমর্থন জোগাড়ের পাশাপাশি সম্ভাব্য বিরোধিতা ঠেকানোর সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন রিক্সড্যাগ ২৮ সেপ্টেম্বর বসার কথা রয়েছে। এরপর সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে। অ্যান্ডারসন নির্ধারিত আলোচনায় সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে পরবর্তী রাজনৈতিক নেতাকে সরকার গঠনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সুইডেনে নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

সুইডেনের রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকার গঠনে সময় লাগার নজির রয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনেও নতুন সরকার গঠনে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছিল। এর আগে বিভিন্ন নির্বাচনের পর জোট গঠনের আলোচনা আরও দীর্ঘ হয়েছে। তাই এবার বিরোধী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতার সামান্য ব্যবধান পেলেও নতুন সরকার কত দ্রুত গঠন করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে দলগুলোর আলোচনার ফলের ওপর।

সব মিলিয়ে সুইডেনের নির্বাচনের ফল দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও সরকার গঠনের সমীকরণ এখনো জটিল। ১৭৬ আসনের বিরোধী জোটের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন থাকলেও শরিক দলগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য অ্যান্ডারসনের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনগুলোতে দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা কতটা তৈরি হয় এবং সংসদে সেই সমর্থন কীভাবে কার্যকর রূপ পায়, তার ওপরই নির্ভর করবে সুইডেনের পরবর্তী সরকারের কাঠামো ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত