কাতার হয়ে উঠছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের নতুন গন্তব্য, মার্কিন ভিসা নীতির অনিশ্চয়তায় আগ্রহ বাড়ছে দোহায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৬৭ বার

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি কঠোর হয়ে উঠার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য যে স্বপ্নের দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত ছিল, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এ পরিস্থিতিতে নতুন বিকল্প হিসেবে ধীরে ধীরে উঠে এসেছে কাতার। দোহার উপকণ্ঠে গড়ে ওঠা ‘এডুকেশন সিটি’ বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এখানে বিভিন্ন নামকরা মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস চালু আছে, যার কারণে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারো শিক্ষার্থী দোহায় এসে নর্থওয়েস্টার্ন, কার্নেগি মেলন, জর্জটাউন, টেক্সাস এ অ্যান্ড এম এবং ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসে ভর্তি হয়েছেন। এর পাশাপাশি ফরাসি বিজনেস স্কুল এইচইসি প্যারিস ও হামাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানও এখানে রয়েছে। কাতার ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এই শিক্ষাকেন্দ্রে এ বছর শিক্ষার্থী ভর্তির হার বেড়েছে ১২ শতাংশ, এবং এখন মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৬৩ জন। যদিও এটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর আসা প্রায় এক মিলিয়ন বিদেশি শিক্ষার্থীর তুলনায় সংখ্যা ছোট, তবে শিক্ষার্থীর বৃদ্ধির ধারা দোহাকে বৈশ্বিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কাতারে কার্যক্রম সম্প্রসারণে অর্থনৈতিক সুবিধাও পাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কর্নেল ইউনিভার্সিটি প্রতিবছর তাদের দোহা মেডিকেল স্কুল পরিচালনার জন্য প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলার পাচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে এই অর্থায়ন মোট ১.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তাছাড়া, জর্জটাউন ও কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের চুক্তি আরও ১০ বছর বৃদ্ধি করেছে, যা এই অংশীদারিত্বের স্থায়ীত্ব নির্দেশ করে।

তবে কাতারের এই উদ্যোগ নিয়ে ওয়াশিংটনে সমালোচনা রয়েছে। কিছু বিশ্লেষক অভিযোগ করেন, কাতারে হামাসের অফিস থাকার কারণে দেশটি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। এই বিতর্কের মধ্যেই ২০২৪ সালে টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কাতার চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। তবে কাতারের পরিকল্পনা থেমে নেই। ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট মারমোলেখো জানিয়েছেন, টেক্সাস এ অ্যান্ড এম-এর ফাঁকা জায়গায় একটি নতুন ‘মাল্টি-ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস’ তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে একাধিক দেশের বিশ্ববিদ্যালয় একসঙ্গে কাজ করবে।

শিক্ষার্থীরা কাতারের দিকে ঝুঁকছে শুধুমাত্র স্বল্প ভিসা অনিশ্চয়তার কারণে নয়, বরং এখানে প্রতিশ্রুত শিক্ষা এবং উন্নত পরিকাঠামোও তাদের আকর্ষণ করছে। ‘এডুকেশন সিটি’তে আধুনিক পাঠাগার, গবেষণা কেন্দ্র, ল্যাবরেটরি এবং আবাসিক সুবিধা সমন্বিত। এই পরিবেশ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার সুযোগ প্রদান করছে। এছাড়া কাতারের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক এবং নিরাপদ, যা অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক নিয়ম-কানুনের বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শিক্ষার্থীরা বিকল্প খুঁজছে। এ প্রেক্ষাপটে কাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। দোহার শিক্ষাকেন্দ্র শুধুমাত্র মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শাখা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক শিক্ষার একটি কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বমানের মানদণ্ড স্থাপন করছে।

কাতারের এই নতুন শিক্ষানীতি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধা নয়, দেশটির অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানকেও সমৃদ্ধ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আসা শিক্ষার্থীরা স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে দোহার স্বীকৃতি কাতারের কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বৃদ্ধি করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও উপকৃত হচ্ছে। মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কাতারে শাখা স্থাপন করে অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে লাভবান হচ্ছে। এই উদ্যোগ তাদের গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থী সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এক জায়গায় এসে একত্রিত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক শিক্ষা বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন ভিসা নীতির কড়াকড়ি কাতারকে নতুন শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানো, শাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রসার এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা—এই সবই একসাথে দোহাকে বৈশ্বিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি শিক্ষার্থী, গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় এখানে আগ্রহী হতে পারে, যা কাতারের আন্তর্জাতিক শিক্ষার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

সংক্ষেপে বলা যায়, মার্কিন ভিসা ও প্রবেশের অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে কাতার বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত আত্মপ্রকাশ করছে। শিক্ষার্থীরা এখানে শিক্ষার পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিচয়, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং সাংস্কৃতিক সমন্বয়ও অর্জন করতে পারছে, যা ভবিষ্যতে তাদের ক্যারিয়ার ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত