প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পরিচালিত এক অভিযানে নতুন করে পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একই ঘটনায় একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির বরাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ এপ্রিল দুটি পৃথক নৌযানে এই অভিযান পরিচালিত হয়, যা আবারও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত “নার্কো-সন্ত্রাসবিরোধী” সামরিক কৌশল নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়। সামরিক বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টের মাধ্যমে জানায়, অভিযানে দুটি পৃথক নৌযান লক্ষ্য করে আকাশ থেকে হামলা করা হয়। একই সঙ্গে হামলার একটি ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেখা যায় সমুদ্রে চলমান নৌযান লক্ষ্য করে বিমান থেকে আঘাত হানা হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রথম হামলায় একটি নৌযানে থাকা তিনজন ব্যক্তির মধ্যে দুইজন নিহত হন এবং একজন জীবিত থাকেন। দ্বিতীয় হামলায় আরেকটি নৌযানে থাকা তিনজন পুরুষ নিহত হন। ফলে সর্বমোট পাঁচজন নিহত এবং একজন জীবিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে জীবিত ব্যক্তির বর্তমান অবস্থা বা তাকে কোথায় রাখা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের আইনি ভিত্তি ও স্বচ্ছতা নিয়ে। অভিযানে যাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তারা সত্যিই মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য ও প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো উপস্থাপন করা হয়নি বলে সমালোচকরা দাবি করছেন। বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের হত্যা করার এই ধারা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে ল্যাটিন আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মাদক পাচার প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে আসছে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক মাদকচক্রগুলো এখন সশস্ত্র ও সংগঠিত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, যাদের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মতোই বিপজ্জনক। এ কারণেই তাদের বিরুদ্ধে “নার্কো-সন্ত্রাসী” শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানানো হয়।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ধরনের অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাদের মতে, সন্দেহের ভিত্তিতে প্রাণঘাতী সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলে নিরীহ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের প্রাণঘাতী অভিযানের ক্ষেত্রে পরিষ্কার প্রমাণ, আইনি কাঠামো এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন।
এদিকে এই সাম্প্রতিক অভিযানের পর চলমান পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এ ধরনের বিতর্কিত অভিযানে মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৬৮ জনে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মাদক পাচার প্রতিরোধের নামে চলমান এই ধরনের সামরিক অভিযান ভবিষ্যতে আরও কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ বা অঞ্চলের জলসীমায় এই ধরনের অভিযান চালানো হচ্ছে, সেগুলোর সার্বভৌমত্ব ও আইনগত এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদক পাচারের নেটওয়ার্কগুলো অত্যন্ত জটিল এবং সহিংস হয়ে উঠেছে, যার ফলে প্রচলিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সামরিক শক্তি প্রয়োগকে তারা “প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা” হিসেবে দেখছেন।
তবে এই যুক্তির বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারের আগে বিকল্প কৌশল যেমন কূটনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আইনগত কাঠামো জোরদার করা আরও কার্যকর হতে পারে।
বর্তমানে জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এই নৌযানগুলোর প্রকৃত কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।
এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষক মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই ধরনের অভিযান যদি আরও বাড়তে থাকে, তবে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে সাম্প্রতিক এই অভিযান শুধু একটি সামরিক ঘটনা নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং মাদকবিরোধী কৌশল নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও গভীর আলোচনার দিকে এগোতে পারে।