সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ: সুবিধা না বিপদ?—বর্তমান ট্রেন্ড ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ জুলাই, ২০২৫
  • ৫৭ বার


প্রতিবেদন: [ ইসমাত আরা জাহান], স্বাস্থ্য ও জীবনধারা বিষয়ক প্রতিবেদক

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং ফিটনেস চর্চার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যেসব বিষয় দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তার অন্যতম হলো “সাপ্লিমেন্ট” বা খাদ্যপূরক গ্রহণ। বিশেষ করে নগরজীবনের ব্যস্ততায় সময় ও পরিপূর্ণ পুষ্টিকর খাবারের অভাবে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন প্রোটিন পাউডার, ভিটামিন, মিনারেল কিংবা ওজন নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট। তবে এই ট্রেন্ডের পেছনে যেমন রয়েছে বিজ্ঞাপননির্ভর আকর্ষণ, তেমনি লুকিয়ে আছে স্বাস্থ্যঝুঁকির এক অদৃশ্য আবরণ।

সাপ্লিমেন্টের জনপ্রিয়তা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিম-ফিটনেস কালচারের প্রসার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রচার, এবং করোনা-পরবর্তী ইমিউনিটি বাড়ানোর সচেতনতাই মূলত এই বাজারকে বিস্তৃত করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার শহরাঞ্চলে সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন সাপ্লিমেন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • Whey Protein ও Plant-based Protein: শরীরচর্চা করা তরুণদের জন্য এটি এখন রুটিনের অংশ।

  • Multivitamin ও Vitamin D, B12: ঘাটতি পূরণের আশায় সাধারণ মানুষও নিয়মিত গ্রহণ করছেন।

  • Fish Oil ও Omega-3: হার্ট ও ব্রেন হেলথের জন্য পরিচিত হলেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

  • Collagen, Biotin: ত্বক, চুল ও নখের যত্নে তরুণীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

  • Fat Burners ও Appetite Suppressants: ওজন কমাতে আগ্রহীরা বেছে নিচ্ছেন বিভিন্ন থার্মোজেনিক বা অ্যানোরেক্সিজেনিক সাপ্লিমেন্ট।

এইসব সাপ্লিমেন্ট শুধুমাত্র ফার্মেসি নয়, আজকাল অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমেও ব্যাপক হারে বিক্রি হচ্ছে, যার অনেকটাই রয়ে গেছে তদারকিহীন।

চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে প্রশ্ন

সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ কি আদৌ নিরাপদ? চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা বলছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনায় ও চাহিদা অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে তা উপকারী হতে পারে, তবে এটি কখনোই একটি পূর্ণাঙ্গ খাবারের বিকল্প নয়।

এছাড়া, নির্দিষ্ট রোগ, বয়স, শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট নির্বাচন করা না হলে তা শরীরের ওপর বিপরীত প্রভাব ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ:

  • অতিরিক্ত ভিটামিন এ গ্রহণে লিভার সমস্যা হতে পারে

  • আয়রনের অতিরিক্ত সেবনে কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাচনতন্ত্রের সমস্যা হতে পারে

  • কিছু সাপ্লিমেন্ট হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিতে পারে যা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য বিপজ্জনক

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে একটি বড় অংশ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করছে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া, যা উদ্বেগজনক। অনেক সময় বিদেশি পণ্যের মোড়কে নকল বা নিম্নমানের পণ্য বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে, যেগুলোর সঠিক ল্যাব টেস্ট বা অনুমোদন নেই।

চিকিৎসকদের সতর্ক বার্তা

ঢাকার বেসরকারি একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুষ্টিবিদ ডা. রাশেদা রহমান বলেন,

“যে কেউ নিজের মতো করে সাপ্লিমেন্ট খাওয়া শুরু করলে তা শরীরের জন্য মারাত্মক হতে পারে। রক্তে যদি কোনো ভিটামিন বা মিনারেলের ঘাটতি থাকে, তাহলে আগে তা নির্ণয় করতে হবে। সাপ্লিমেন্ট হতে হবে চিকিৎসা নির্দেশনার অংশ, বিলাসিতা নয়।”

তিনি আরও বলেন, “বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা, কিডনি বা লিভার রোগী, শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের অনুমতি নিতে হবে।”

সরকার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মাঝেমধ্যে ভেজাল সাপ্লিমেন্টের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও, বাজারে এখনো সহজলভ্য কিছু “হারবাল”, “নেচারাল” বা “আমেরিকান ব্র্যান্ড” নামধারী সাপ্লিমেন্ট রয়েছে যেগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া এই সেক্টরে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্ভাবনা থেকেই যায়।

উপসংহার

সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ এখন আর শুধু ফিটনেসপ্রেমীদের অভ্যাস নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে নগরজীবনের ‘নিউ নর্মাল’। তবে যতটা না প্রয়োজন থেকে এই প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে মার্কেটিং ও সামাজিক চাপের কারণে।
এই বাস্তবতায় প্রয়োজন জনগণের মধ্যে সচেতনতা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও বিজ্ঞজনদের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক পন্থায় সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ। না হলে শরীর গঠনের আশায় শুরু হওয়া এক সহজ অভ্যাসই হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ।


সংগ্রহ ও অনুসন্ধান: আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নাল, বাংলাদেশ ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, নিউট্রিশন এক্সপার্টদের সাক্ষাৎকার এবং অনলাইন বিক্রয়প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত