প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা। সোমবার দেওয়া এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া, উদ্বেগ এবং কূটনৈতিক উত্তাপ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা আবারও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে জানা যায়, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বা প্রবেশাধিকার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয়। এরই প্রেক্ষাপটে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ কার্যকরের ঘোষণা দেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সময় সোমবার সকাল ১০টা থেকে ইরানি বন্দরে প্রবেশকারী এবং সেখান থেকে বের হওয়া সব জাহাজ আটক করা শুরু হয়েছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের নৌবাহিনী কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং তাদের বহু সামরিক সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। তিনি বলেন, ইরানি ‘হামলাকারী জাহাজ’ যদি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কাছাকাছি আসে, তবে সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। একইসঙ্গে তিনি কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী যেকোনো আক্রমণকারী ইরানিকে প্রতিহত করবে এবং প্রয়োজনে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেবে।
এই ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডও (সেন্টকম) জানায়, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী ইরানি বন্দরগুলোর চারপাশে নৌ অবরোধ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যদিও পরে তারা ব্যাখ্যা করে জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অন্যান্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করা হবে না। তবে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের আশপাশে ইরানি বন্দরঘেঁষা এলাকায় সব দেশের জাহাজ চলাচলে কঠোর নজরদারি থাকবে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ইসলামাবাদে ব্যর্থ আলোচনার পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে পুনরায় বিমান হামলার বিষয়েও বিবেচনা করছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি, তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে চলমান আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে ইরান ট্রাম্পের এই হুমকিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কঠোর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ইরান কোনো ধরনের চাপ বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালির কাছে যেকোনো সামরিক জাহাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দাবি করেন, ইসলামাবাদের আলোচনায় একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি এবং ক্রমাগত শর্ত পরিবর্তনের কারণে আলোচনা ভেস্তে যায়। তিনি বলেন, এ ধরনের নীতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই আরও কঠোর ভাষায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে এবং ইতিহাসে এটি আরেকটি রাজনৈতিক ভুল হিসেবে চিহ্নিত হবে। তিনি দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে রয়েছে যা যেকোনো ধরনের সামুদ্রিক অবরোধ মোকাবিলা করতে সক্ষম।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসিও ট্রাম্পের হুমকিকে ‘ডাকাতির শামিল’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে এবং কোনো শত্রু দেশের জাহাজকে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে তারা একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয়, মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো ইরানি নৌবাহিনীর সতর্কবার্তার পর পিছু হটেছে।
এই উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাজ্য, রাশিয়া এবং স্পেনসহ বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, তারা ইরানের বন্দর অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না, যদিও তারা ওই অঞ্চলে নজরদারি ও মাইন অপসারণ কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে রাশিয়া এই অবরোধ পরিকল্পনাকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছে। স্পেন একে ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছে।
এই ঘটনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হওয়ায় উত্তেজনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কয়েক শতাংশ বেড়ে ১০০ ডলারের বেশি ছাড়িয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। জার্মানি ঘোষণা দিয়েছে, জ্বালানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে স্বস্তি দিতে তারা সাময়িকভাবে পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর কর কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পদক্ষেপ মূলত বৈশ্বিক তেল বাজারের অস্থিরতার প্রভাব কমানোর একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়, ফলে এখানে অস্থিরতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না হলে তা বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।