প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশির কিনারায় অবস্থিত চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলা। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে এই উপকূলীয় জনপদ প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের লোনা পানির আগ্রাসনের শিকার হয়। হাজারো মানুষের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার অবলম্বন এই জনপদকে রক্ষা করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, জনগণের করের টাকায় নির্মিত এই অতি প্রয়োজনীয় প্রকল্পটি এখন দুর্নীতির কালো ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম এই প্রকল্পের ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম অধিবেশন চলাকালীন তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা দুটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই এলাকাগুলো প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। সমুদ্রের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়, যা হাজারো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। তিনি জানান, স্থানীয় জনসাধারণের কাছ থেকে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি কয়েক দিন আগে সরেজমিনে বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজের মান ও অগ্রগতি পরিদর্শন করেছেন। তার এই সরেজমিন পরিদর্শনকালে স্থানীয়দের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার মতো অনেক চিত্রই তিনি দেখতে পেয়েছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সংসদ সদস্যের ভাষ্যমতে, বেড়িবাঁধ নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণ এবং কাজের মানের ক্ষেত্রে যে গাফিলতি পরিলক্ষিত হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ যেন সঠিকভাবে কাজে লাগে এবং প্রকল্পের প্রতিটি ইঞ্চিতে যাতে গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সংসদীয় অধিবেশনে তিনি এই বিষয়টি উত্থাপন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের নীতিনির্ধারকদের কাছে দ্রুততর সময়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল পাঠিয়ে কাজের অনিয়ম খতিয়ে দেখা হবে এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে আনোয়ারা উপকূলের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল, তা আজও ভোলার নয়। হাজারো মানুষের প্রাণহানি ও সম্পদের যে ধ্বংসলীলা সেই সময় ঘটেছিল, তা বাংলাদেশের উপকূলীয় ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে। সেই ভয়াবহ দুর্যোগের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ব্যক্তিগতভাবে আনোয়ারা উপকূল পরিদর্শনে এসেছিলেন এবং উপকূলীয় মানুষের জানমাল রক্ষায় স্থায়ী ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশের পরপরই আনোয়ারা উপকূলের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল এবং তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়েও বেড়িবাঁধের কাজ চলমান রয়েছে।
এত বছরের পুরোনো একটি প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং দুর্নীতির অভিযোগ আসা স্থানীয় জনগণের জন্য চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেড়িবাঁধ কেবল একটি কাঠামো নয়, এটি উপকূলীয় লাখো মানুষের নিরাপত্তার প্রাচীর। যদি নির্মাণের শুরুতেই অনিয়মের মাধ্যমে এই প্রাচীরকে দুর্বল করে রাখা হয়, তবে আগামীতে কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই এলাকার মানুষ চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সংসদ সদস্যের বক্তব্যে মানুষের সেই চাপা ক্ষোভ ও উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ও জোরালো কণ্ঠে দাবি করেছেন যে, প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থের প্রতিটি পয়সার স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করতে হবে এবং জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা চলবে না।
প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকা উপকূলীয় মানুষের জন্য একটি টেকসই বেড়িবাঁধ তাদের বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত। সরওয়ার জামাল নিজাম সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন তিনি নিজে অথবা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে দ্রুত আনোয়ারা পরিদর্শন করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি পর্যবেক্ষণ থাকলে অনিয়মের পথ বন্ধ হবে এবং কাজের গতি ও মান দুই-ই বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে তিনি প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য সরকারি কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সংসদ সদস্যের এই সাহসী পদক্ষেপ স্থানীয় জনগণের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। তারা মনে করছেন, জাতীয় সংসদে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হওয়ায় এখন আর অনিয়ম করে পার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর মানুষ এখন কেবল একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের অপেক্ষায় আছে, যা তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং লোনা পানির আগ্রাসন থেকে কৃষি ও বসতভিটা রক্ষা করবে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সরওয়ার জামাল নিজাম যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অনুসরণের যোগ্য। এখন দেখার পালা, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কতটা দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।